চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকায় অপহরণের দুই দিন পর পাঁচ বছর বয়সী শিশু জায়ানের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। মুক্তিপণের দাবিতে রেখে যাওয়া একটি হাতে লেখা চিরকুটের সূত্র ধরেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এক নারীসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভোরে ডিবি পুলিশ ও পটিয়া থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকার একটি ময়লার ভাগাড় থেকে শিশুটির বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন সাদিয়া আক্তার নিহা, তার বাবা সাইফুল ইসলাম ও মা শাহানুর আক্তার। নিহা স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে বাড়ির সামনে খেলাধুলার সময় হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় জায়ান। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে পটিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের কিছু সময় পর পরিবারের ঘর থেকে একটি হাতে লেখা চিঠি উদ্ধার করা হয়। চিঠিতে শিশুটিকে ফিরিয়ে দেওয়ার শর্তে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। একই সঙ্গে পরিবারের একটি আনলক করা মোবাইল ফোন নির্দিষ্ট স্থানে রেখে যেতে বলা হয়েছিল। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাদুদ আলম জানান, তদন্তের একপর্যায়ে উদ্ধার হওয়া চিরকুটের হাতের লেখার সূত্র ধরে আশপাশের কয়েকটি বাসায় তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় সাদিয়া আক্তার নিহার ঘর থেকে চিরকুটে ব্যবহৃত নোটবই এবং একই ধরনের লেখার খসড়া উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে নিহা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেফতার তিনজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে এটি অপহরণের পর হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রকৃতপক্ষে পারিবারিক বিরোধের জেরেই এ ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিপণের বিষয়টি ছিল তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি কৌশল।
পুলিশের ভাষ্যমতে, নিহা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, পারিবারিক বিরোধের কারণে শিশুটিকে নিয়ে গেলেও একপর্যায়ে তার মৃত্যু ঘটে। পরে ঘটনাটি আড়াল করতে মুক্তিপণের চিরকুট রেখে অপহরণের নাটক সাজানো হয়।
শিশুটির বাবা শাহজান অভিযোগ করেন, ঘটনার পর অভিযুক্তদের কয়েকজন পরিবারের সঙ্গে শিশুটিকে খোঁজার কাজেও অংশ নিয়েছিল, যাতে তাদের প্রতি সন্দেহ না হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশের তদন্তেই প্রকৃত ঘটনা সামনে আসে।
এদিকে শিশু জায়ানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় শত শত মানুষ বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পটিয়া থানা প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বিক্ষোভকারীরা দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
পরে বিক্ষোভকারীরা থানা প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তার আশ্বাসে বিক্ষোভকারীরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। এলাকাবাসী দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/আতা