যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ প্যান্ডোরার বাক্স উন্মোচিত

ব্রিগে. জেনা. মো. জাহেদুর রহমান (অব.)

মতামত

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রত্যুষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের কমান্ড সেন্টার, সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা এমনকি বেসামরিক স্থাপনার ওপর

2026-06-19T05:06:02+00:00
2026-06-19T05:06:02+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
মতামত
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ প্যান্ডোরার বাক্স উন্মোচিত
ব্রিগে. জেনা. মো. জাহেদুর রহমান (অব.)
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৫:০৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রত্যুষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের কমান্ড সেন্টার, সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা এমনকি বেসামরিক স্থাপনার ওপর সমন্বিত বিমান হামলা শুরু করে। এ ছাড়া আমেরিকার রণতরীগুলো থেকে টমাহক মিসাইল ছোড়া হয়। 

বিগত তিন মাসের অধিক যুদ্ধে এ পর্যন্ত দশ হাজারেরও অধিক মৃত্যু এবং চল্লিশ হাজারেরও অধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যানগুলো যদিও নিশ্চিত সংখ্যা নয়, তথাপি এই ‘উন্মত্ত যুদ্ধের’ ভয়াবহতা নির্দেশ করে। যে হামলা একটি কৌশলভিত্তিক হামলা হিসেবে পরিকল্পিত ছিল সেটি এমন একটি প্যান্ডোরার বাক্স উন্মোচিত করেছে, যা নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছে।

এই যুদ্ধের বিপর্যয় সৃষ্টিকারী প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বের শেয়ারবাজারের পারদ প্রতিটি হামলার সঙ্গে ওঠানামা করেছে, রাষ্ট্রীয় জোটগুলোয় টানাপোড়েন বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামো ভীষণ চাপের মুখে আছে। সংবাদ কক্ষ থেকে লেকচার হলো- সংসদ থেকে জনসমাগমস্থল এমনকি চায়ের দোকান পর্যন্ত বিতর্ক অবিরাম চলছে। 

প্রতিটি ভূরাজনৈতিক তত্ত্ব পরীক্ষার সম্মুখীন, প্রতিটি অর্থনৈতিক মডেল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং প্রতিটি কূটনৈতিক সম্পর্ক শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। এই যুদ্ধে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে লড়াই হচ্ছে না; এই যুদ্ধ হয়েছে এবং হচ্ছে ন্যারেটিভ, বৈধতার উপাখ্যান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে।

একটি প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরান কেন আক্রমণ করেছে?
এই ‘উন্মত্ত যুদ্ধের’ কারণ নিরাপত্তাবোধ, জোটবদ্ধতা ও আনুগত্য, প্রতিরোধ লক্ষ্য এবং ভূরাজনৈতিক গাণিতিক হিসাবের এক জটিল সমীকরণের মধ্যে নিহিত। 

প্রথমত যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে। তারা এটিও মনে করে যে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং কেবল সামরিক পদক্ষেপই ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করা থেকে বিরত রাখতে পারে। 

দ্বিতীয়ত আক্রমণের একটি লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা দুর্বল করা। এটা বাস্তব যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যীয় ঘাঁটিগুলো, ইসরাইল, উপসাগরীয় এবং আঞ্চলিক দেশগুলোতে হুমকির মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশ্ব মোড়ল’ ইমেজে আঘাত করেছে।

তৃতীয়ত ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে তার প্রধান কৌশলগত হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছিল, কারণ তেহরান হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথিদের মতো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করে এবং ইসরাইলের আঞ্চলিক প্রভাবের বিরোধী। এই যৌথ সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলের নিরাপত্তার প্রতি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হয়েছে। এই প্রক্সি গ্রুপগুলোকে দুর্বল করা সামরিক অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।

চতুর্থত এই সংঘর্ষের একটি ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা আছে- ইরানকে দুর্বল করার মাধ্যমে ‘এক্সিস অব রেসিসট্যান্স’ এর প্রভাবকে লাগাম পড়ানো। অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তি যেমন রাশিয়া, চীন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করা হলো।

পঞ্চমত ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ ভূরাজনৈতিক বৈরিতা, নিরাপত্তাবোধ এবং কৌশলগত সমীকরণ ইসরাইলকে এই আক্রমণ চালাতে তাড়িত করেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইসরাইল তার অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে গণ্য করে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কার্যক্রম সীমিত হওয়ার কারণে ইসরাইল সামরিক পদক্ষেপ অত্যাবশ্যক মনে করেছে।

ষষ্ঠত বিশ্লেষকরা মনে করেন যে এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইরানের তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অন্যতম অভিপ্রায় ছিল।
সম্পূর্ণ প্যান্ডোরার বাক্সটি বুঝতে হলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, উপসাগরীয় এবং আঞ্চলিক দেশগুলো, পরাশক্তিগুলো এবং বিবদমান পক্ষগুলোর লক্ষ্য ও ভূমিকা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

জাতিসংঘ বরাবরের মতো জরুরি অধিবেশন করেছে, ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার নিন্দা জানিয়েছে এবং যুদ্ধ বিরতির আহ্বান করেছে। কিন্তু জাতিসংঘের স্ববিরোধিতা বিদ্যমান; বৈধতার প্রশ্নে শক্তিশালী তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভীষণ দুর্বল। যে কোনো গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতার কাছে জিম্মি। এই যুদ্ধ প্রশমনে জাতিসংঘের ভূমিকা ফলপ্রসূ হস্তক্ষেপের পরিবর্তে প্রতীকী কূটনৈতিক পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের যুদ্ধের উত্তেজনা হ্রাস করা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহবান জানিয়ে মধ্যস্থতার চেষ্টায় অসফলতা লক্ষণীয়। এই সংঘের সদস্যদের মাঝে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং মার্কিনি নিরাপত্তা আবরণের ওপর নির্ভরশীলতা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে অগ্রণী ভূমিকা রাখা থেকে বিরত রেখেছে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য যুদ্ধ-পরবর্তী হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে ন্যাটো যদিও সামরিক দিক থেকে সক্ষম ও অত্যন্ত শক্তিশালী; কিন্তু এর আর্টিকেল ৫ প্রয়োগ না করা পর্যন্ত ন্যাটো সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবেই ন্যাটোর দ্বিধাগ্রস্ত ভূমিকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালের বার্তায় বেশ কয়েকবার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নিস্পৃহতায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

আরব লীগ বিভক্ত হয়ে বিশ্বে এর প্রতিফলন ঘটে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে সুগভীর বিভাজন- মার্কিনপন্থি, রাশিয়াপন্থি, ইরানপন্থি। এই বিভাজনগুলো কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট বাধা। এই সংগঠনটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে তবে ঐক্যের চেয়ে এর মধ্যকার মতবিরোধই বেশি প্রতিফলিত হয়।

এসব সংগঠনের ভূমিকা এবং সক্ষমতা বিচার করলে যে সত্যটি প্রতিভাসিত হয় সেটি হলো এরা এই যুদ্ধ প্রশমনে কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ। জাতিসংঘ কূটনৈতিক পদক্ষেপের বৈধতা প্রদান করে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, ন্যাটো সামরিক সক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে এবং আরব লীগ আঞ্চলিক মনোভাবের প্রতিফলন ঘটাতে পারে। 

কিন্তু এদের সবার সক্ষমতা সার্বভৌমত্ব, ভূরাজনীতি এবং বিশ্ব মোড়লদের দ্বন্দ্বের কারণে সীমাবদ্ধ। এই যুদ্ধ একদিকে যেমন এদের সীমাবদ্ধতা উন্মোচিত করেছে অন্যদিকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রত্যক্ষভাবেই জড়িয়ে পড়েছে। এই দেশগুলোর বাইরে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং ভারতের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। উত্তেজনা প্রশমন, যুদ্ধ বিরতি এবং স্থায়ী সমাধানে এদের সবারই অল্পবিস্তর ভূমিকা ছিল। 

মিসর মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। মিসর সুয়েজ ক্যানেল নিয়ন্ত্রণ করে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিবেশী আরব দেশগুলো এবং আঞ্চলিক শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে বৃহত্তর আরব-ইসরাইল যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া থেকে মিসর চেষ্টা করছে। 

মিসরের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে তার অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা। মিসরের আরেকটি আশঙ্কার জায়গা হচ্ছে শরণার্থী বৃদ্ধি পাওয়া এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা অস্থিতিশীল হওয়া, বিশেষ করে সিনাই উপত্যকা। সার্বিকভাবে নিজ দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা কিংবা সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন না হলে মিসর এই যুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

জর্ডান হচ্ছে ইসরাইলের সঙ্গে ইরান এবং ইরাকের মধ্যকার বাফার স্টেট এবং ইসরাইল, প্যালেস্টাইন, সিরিয়া ও সৌদি আরবের প্রতিবেশী এই রাষ্ট্র ভৌগোলিক কারণে বেশ নাজুক অবস্থায় আছে। স্বীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জর্ডান এই যুদ্ধে তার আকাশসীমায় বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিধ্বংস করেছে। এই দেশ অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। যদিও জর্ডান আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস ও সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহবান জানিয়েছে স্পষ্টতই জর্ডান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

ইয়েমেন ইরান-সমর্থিত হুথিদের মাধ্যমে লোহিত সাগর, রাজধানী সানাসহ দেশের উত্তরাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যার ফলশ্রুতিতে এই সমুদ্রপথে বিশ্ববাণিজ্য ব্যাহত হয়। এই সংঘর্ষে ইয়েমেন প্রচলিত পক্ষ নয়, তবে ইয়েমেন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্সি-যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবেই কাজ করে। কৌশলগত দিক থেকে ইয়েমেন ইরানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘অ্যাসিমেট্রিক প্রেশার পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে। ইয়েমেন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে যেমন ইসরাইলকে ঝুঁকির মুখে রাখে তেমনি লোহিত সাগরে ‘বাব এল মান্দেব’ প্রণালিতে প্রভাব রাখতে পারে। 

‘বাব এল মান্দেব’-এ হুথিদের হস্তক্ষেপ এই সমুদ্রপথে চলাচল ঝুঁকির কারণ হবে। তবে ইয়েমেন কিছু বিচ্ছিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ ছাড়া এখনও এই সংঘর্ষে সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেনি। এতে প্রতীয়মান হয় যে, হুথিদের সিদ্ধান্ত-গ্রহণ প্রক্রিয়া ইরানের সঙ্গে সমন্বয় এবং কিছুটা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন উভয়কেই প্রতিফলিত করে। ইসরাইল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে ব্যাপক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা ও ইয়েমেনে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখা এর পেছনে মূল কারণ বলে অনুমিত হয়। এভাবেই ইয়েমেন এই সংঘর্ষে একটি দ্বিতীয় কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্সি-যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এর গুরুত্ব সামরিক শক্তিতে নয় বরং যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়ানোর ক্ষমতা, বৈশ্বিক বাণিজ্যকে চাপের মধ্যে ফেলা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাকে জটিল করার মধ্যে নিহিত।

লেবানন ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ বাহিনীর ঘাঁটি। এটি ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রক্সি-যুদ্ধক্ষেত্র। হিজবুল্লাহ এই সংঘাতকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে এবং ইরানের সমর্থনে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে শত্রুতা বাড়ার পর, হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে রকেট এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে একটি উত্তরাঞ্চলীয় ফ্রন্ট খোলে, যা সংঘাতকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করে। ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে হিজবুল্লাহ তার সবচেয়ে সক্ষম আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে কাজ করে এবং ইসরাইলের সামরিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে ভূমিকা রাখে। 

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরাইল সংঘাতে উপসাগরীয় দেশগুলো একটি সতর্ক, বাস্তববাদী এবং মূলত প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করেছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলো- বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমান- তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার পাশাপাশি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়ানোর চেষ্টা করেছে। 

যদিও বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় রাষ্ট্র ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মতো একই উদ্বেগ পোষণ করে, তারা এও স্বীকার করে যে একটি বিস্তৃত যুদ্ধ তাদের তেল স্থাপনা, বন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে প্রতিশোধমূলক হামলার মুখে ফেলতে পারে। তাদের অর্থনীতি স্থিতিশীল জ্বালানি বাজার, নিরবচ্ছিন্ন সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলস্বরূপ বেশিরভাগ উপসাগরীয় সরকার সামরিক অংশগ্রহণের পরিবর্তে উত্তেজনা প্রশমন এবং কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে।

সিরিয়া মার্কিন-ইরান-ইসরাইল সংঘাতে একটি কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র এবং সংযোগকারী পথ হিসেবে কাজ করে। তেহরান উপদেষ্টা, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সদস্য এবং সহযোগী মিলিশিয়াদের মোতায়েন করেছে এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর জন্য একটি স্থল করিডোরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যা অস্ত্র স্থানান্তর এবং সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ঘন ঘন ইসরাইলি বিমান হামলার কারণ হয়েছে। 

দামেস্কের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন মার্কিন ও ইসরাইলি পদক্ষেপকে জটিল করে তুলেছে, অন্যদিকে পূর্ব সিরিয়ায় সীমিত সংখ্যক মার্কিন বাহিনী আইএসআইএসের মোকাবিলা করতে এবং ইরানের সম্প্রসারণকে সীমিত করতে কাজ করছে। সিরিয়া রাজনৈতিক-সামরিক সমর্থনের জন্য ইরানের উপস্থিতি সহ্য করে, যা সিরিয়ার সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের হামলা ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে ফেলছে। এভাবে সিরিয়া আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে এবং উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলে। 

তুরস্ক মার্কিন-ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার ক্ষেত্রে নিজেকে একটি আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষাকারী এবং মাঝে মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করে। ন্যাটোর সদস্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত হওয়ায় আঙ্কারা তেহরানের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক এবং ইসরাইলের সঙ্গে পর্যায়ক্রমিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাও বজায় রাখে। তুরস্ক সিরিয়া এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তার ভৌগোলিক প্রবেশাধিকার, আকাশসীমা এবং প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে শক্তি প্রদর্শন করে এবং উত্তেজনার বিস্তার সীমিত রাখে। 

এটি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতাদের আতিথ্য দেয় এবং ইসরাইলি সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করে। আঙ্কারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বার্থ রক্ষা, শরণার্থী প্রবাহ ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে চায় এবং কার্যকরভাবে উত্তেজনা হ্রাস করার জন্য কূটনীতি ও শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতা করে।

ভারত এই সংঘর্ষে সরাসরি অংশগ্রহণের পরিবর্তে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাকারীর ভূমিকায় আছে। তার জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে কোনো পক্ষ অবলম্বন না করে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং উত্তেজনা প্রশমনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। ভারতের একদিকে যেমন ইসরাইলের সঙ্গে দৃঢ় সামরিক এবং প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আছে তেমনই ইরানের সঙ্গে মজবুত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। 

আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্ব আছে; যদিও এই কৌশলগত অংশীদারত্ব সম্পর্কটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্কারোপ সংক্রান্ত পদক্ষেপের কারণে ও ভারতের রাশিয়া ঘেঁষা অবস্থানের কারণে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারতের মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা এবং ওই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকদের উপস্থিতি ভারতকে সরাসরি কোনো পক্ষালম্বন থেকে বিরত রেখেছে। ভারতের মূল লক্ষ্য স্বীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। এটি স্পষ্ট যে, ভারত সরাসরি কোনো সামরিক কিংবা মধ্যস্ততা ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না।

লেখক : ডিরেক্টর জেনারেল, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   যুক্তরাষ্ট্র  ইরান  ইসরাইল  যুদ্ধ 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: