জন্ম থেকেই দুটি পা অচল। জীবনের প্রতিটি পথ পাড়ি দিতে হয় হাতের ওপর ভর করে। ছোটবেলা থেকেই একের পর এক দুঃখ-কষ্ট আর বঞ্চনা সঙ্গী হলেও হার মানেননি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাচ্চর ইউনিয়নের হোগলার মাঠ বালাকান্দি গ্রামের যুবক মো. জিসান মোল্লা।
জিসানের বাবা মৃত মো. সেলিম মোল্লা। মাত্র ছয় বছর বয়সে পারিবারিক কলহের জেরে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর মা তাকে রেখে চলে যান। ছোট্ট জিসানের দায়িত্ব এসে পড়ে বৃদ্ধ দাদা-দাদীর কাঁধে। তাদের স্নেহ-ভালোবাসাতেই বেড়ে ওঠেন তিনি।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও লেখাপড়ার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। প্রতিদিন বৃদ্ধ দাদা-দাদী তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। তবে বাড়ি থেকে স্কুলের দীর্ঘ পথ, বাঁশের সাঁকো ও ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।
তিন বছর আগে বাবার মৃত্যু তার জীবনে নতুন করে অন্ধকার নামিয়ে আনে। বর্তমানে তিনি বৃদ্ধ দাদা-দাদীর সংসারেই থাকেন। বয়সের ভারে দাদা তেমন কোনো কাজ করতে পারেন না। তাই নিজেকে পরিবারের ওপর বোঝা মনে করেন জিসান।
তবে জীবনের কঠিন বাস্তবতার কাছে মাথা নত করেননি তিনি। ভিক্ষাবৃত্তিকে না বলে অল্প কিছু টাকা জোগাড় করে বাড়ির পাশে বাঁশের মাচা তৈরি করে ছোট্ট একটি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় সেই উদ্যোগ বেশি দিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে শিবচর বাজারের লালন মঞ্চের সামনে ফুটপাতে ছোট্ট একটি সবজির দোকান বসান জিসান। নিজের কোনো মূলধন না থাকায় বাকিতে সবজি কিনে বিক্রি করেন। অনেক সময় নিম্নমানের সবজি দিয়েও ব্যবসা চালাতে হয় তাকে। তারপরও থেমে নেই তার সংগ্রাম।
স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, বাজারে যেতে তাকে ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। হাতের ওপর ভর করে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান তিনি। বর্ষা মৌসুমে কাদামাটিতে ভরা রাস্তা ও যানবাহনের সংকটের কারণে নিয়মিত বাজারে যাওয়া সম্ভব হয় না। একদিন দোকান বন্ধ থাকলেই অবিক্রিত সবজি নষ্ট হয়ে যায়, যা তার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জীবনের কষ্ট যেন তার পিছু ছাড়ছে না। প্রায় ছয় মাস আগে কিছু মানুষের উদ্যোগে বিয়েও করেছিলেন জিসান। তবে প্রতিবন্ধকতার কারণে স্ত্রী তাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। কয়েক মাসের মধ্যেই স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এতে মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েন তিনি।
বর্তমানে দৈনন্দিন খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে জিসানকে। সরকারি সহায়তার মধ্যে শুধু প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও অন্য কোনো সহযোগিতা পাননি তিনি। ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে ছোট্ট সবজির দোকানটিও বন্ধ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জিসান মোল্লা বলেন, আমি চাইলে মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতে পারতাম। কিন্তু আমি ভিক্ষা করে খেতে চাই না। নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করে খেতে চাই। যদি একটি ছোট ইলেকট্রিক গাড়ি বা হুইলচেয়ার এবং ব্যবসার জন্য কিছু মূলধন পেতাম, তাহলে নিজের পাশাপাশি বৃদ্ধ দাদা-দাদীকেও নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারতাম।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রতিবেশীরা জানান, জিসান একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও পরিশ্রমী মানুষ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ভিক্ষাবৃত্তি না করে ব্যবসা করে বাঁচার চেষ্টা করছেন। তারা উপজেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
জিসানও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, চলাচলের জন্য একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার বা ছোট যানবাহন এবং ব্যবসার জন্য কিছু আর্থিক সহায়তার।
স্থানীয়দের মতে, সামান্য সহযোগিতা পেলেই জিসান মোল্লা কারও বোঝা হয়ে নয়, নিজের আত্মবিশ্বাসকে শক্তি করে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারবেন।
সময়ের আলো/আতা