সংরক্ষিত বনে সুউচ্চ বাউন্ডারি

শেখ রাসেল টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

সারাদেশ

কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বিশাল আয়তনজুড়ে নির্মাণ হচ্ছে সুউচ্চ বাউন্ডারি। বন বিভাগের আপত্তির মাঝেও বনাঞ্চলে বিশাল আয়তনের এই বাউন্ডারি

2026-06-20T02:17:51+00:00
2026-06-20T02:24:22+00:00
 
  শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সংরক্ষিত বনে সুউচ্চ বাউন্ডারি
শেখ রাসেল টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ২:১৭ এএম  আপডেট: ২০.০৬.২০২৬ ২:২৪ এএম
ছবি : সময়ের আলো
কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বিশাল আয়তনজুড়ে নির্মাণ হচ্ছে সুউচ্চ বাউন্ডারি। বন বিভাগের আপত্তির মাঝেও বনাঞ্চলে বিশাল আয়তনের এই বাউন্ডারি নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের নয়াপাড়া শালবাগানস্থ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সেগুনবাগান এলাকায় নির্মাণ হচ্ছে সুউচ্চ এই বাউন্ডারি। যদিও এনজিও সংস্থা এবং তদারকের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই বনাঞ্চলের সুউচ্চ এই দেয়ালটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) অফিস সূত্র জানিয়েছে, বনাঞ্চলের দেয়াল নির্মাণের জন্য বন বিভাগ থেকে কোনো ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে বনাঞ্চলে সুউচ্চ ও লম্বা দেয়াল নির্মাণের খবর পেয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার তরফ থেকে কাজটি না করার জন্য কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বন বিভাগের নির্দেশনাকে অমান্য করে বাস্তবায়নকারী এনজিও সংস্থা অনবরত কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। ডিএফও অফিস জানায়, বনাঞ্চলে বাউন্ডারি নির্মাণ না করতে গেল ঈদুল আজহার আগে (২৬ মে) বিভাগীয় বন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত চিঠি আরআরআরসি অফিসে প্রেরণ করা হয়েছে। 

বন বিভাগ সূত্র জানায়, ২৬নং ক্যাম্পের পেছনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রয়েছে হাতির চলাচলের করিডোর। ওই করিডোর দিয়ে হাতি নিয়মিত চলাচল করে। পাহাড় পরিবেষ্টিত পাদদেশে হাতি চলাচলের করিডোরজুড়ে বাউন্ডারিটি নির্মিত হচ্ছে। এতে পুরো করিডোরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ওই করিডোর দিয়ে হাতি চলাচলের পথ একেবারেই রুদ্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া টেকনাফ বনাঞ্চলের ওই এলাকায় ২৭০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য স্থান। পাহাড়ের ওই এলাকাজুড়ে প্রকৃতিগতভাবে পশুপাখির খাদ্যের উৎপাদনস্থল। দেখা গেছে, বনের মাঝে দেয়াল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে। এখনও পলেস্তারা তথা ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে। পাহাড় পরিবেষ্টিত বিশাল আয়তনজুড়ে সুউচ্চ দেয়ালটি নির্মাণ হওয়ায় হাতি চলাচলের করিডোর যেমন বন্ধ হয়ে পড়বে, তেমনি জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। বন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বন ও বন্যপ্রাণী অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। 
আরও পড়ুন

টেকনাফ রেঞ্জের আওতাধীন বনপাহারা দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের ওই এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির বানর, শিয়াল, ভাল্লুক, বন মোরগ, হাতি, সরীসৃপ প্রাণীসহ বন্যপ্রাণীর বিচরণ এখনও চোখে পড়ে। রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসস্থল তৈরির কারণে বন্যপ্রাণীর জন্য বনের কাছাকাছি জীববৈচিত্র্যময় জায়গা এখন বন্যপ্রাণীর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। তাই তারা গহিন বনে নিজেদের ঠিকানা করে নিয়েছেন। এতে একদিকে খাদ্য সংকট। অন্যদিকে বিপন্ন আবাসস্থল। এতেই মহাসংকটে টেকনাফের বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী।

তার মাঝে মুচনী বিটের শালবাগানের ওপারে বনের মাঝে সুউচ্চ ও বিশাল আয়তনের বাউন্ডারি নির্মাণ হলে ২৭০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর চলাচল হুমকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া বনাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে উঠলে বন্যপ্রাণী এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ নিশ্চিত করা যেমন প্রয়োজন। তেমনি বনের গাছ-গাছালি এবং বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। 

বন্যপ্রাণী গবেষক সরোয়ার আলম দীপু বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থাপনা বা কোনো ধরনের কিছু করতে হলে সবার আগে অবশ্যই ‘এনভাইরনমেন্ট ইমপেক্ট এসেসম্যান্ট’ তথা ইআইএ করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে বন এবং বন্যপ্রাণীর ওপর যেন কোনো প্রভাব না পড়ে। 

এদিকে ২৬নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জানান, আসলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের কোনো হাত নেই। যদ্দুর জানি, আরআরআরসির মাধ্যমে ইউএনডিপি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন। 

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা-ডিএফও (কক্সবাজার দক্ষিণ) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে হাতি চলাচলের করিডোরে বিশাল আয়তনজুড়ে সুউচ্চ ওয়াল নির্মাণ হওয়ার বিষয়টি অবগত হওয়ার পরপরই কাজটি বন্ধ রাখতে তিনি আরআরআরসি তথা কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনারকে লিখিতভাবে জানান। তিনি বনের মাঝে বিশাল আয়তনজুড়ে ওয়াল নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে আবারও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার বরাবর চিঠি লিখবেন বলে জানিয়েছেন। 

জানতে চাইলে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লাখ লাখ লোকের সৃষ্ট বর্জ্য; সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে পরিবেশ দূষিত হবে। আধুনিক পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে ইউএনডিপি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বনের মধ্যে ওয়াল করাটা খারাপ; অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করাটা আরও খারাপ। সর্বোপরি পরিবেশ সংরক্ষণের তাগিদেই কাজটি করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। পরিবেশবাদী সংগঠনসহ স্থানীয় সচেতন মহল বন ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা এবং হাতি চলাচলের করিডোর বন্ধ না করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৬নং শালবাগান ক্যাম্পের প্রান্ত সীমানায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে নির্মিতব্য সুউচ্চ এই বাউন্ডারি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে নির্মিতব্য বাউন্ডারির উচ্চতা ৫ মিটার ও দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৭ মিটার। নির্মাণকাজ তদারকে নিয়োজিত এক প্রতিনিধি জানান, ইউএনডিপি সরাসরি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এটি করা হচ্ছে বলে ওই প্রতিনিধি জানিয়েছেন। 

তবে স্থানীয়দের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বনের ভেতরে এত বিশাল এলাকাজুড়ে সুউচ্চ বাউন্ডারি নির্মাণ হলে জীববৈচিত্র্যে যেমন ক্ষতিতে পড়বে। তেমনি ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জন্যও দূর ভবিষ্যতে এটি অন্যতম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রোহিঙ্গা নেতাদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে ওই বাউন্ডারিকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকা অপরাধজোন হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের শালবাগান ও ন্যাচারপার্ক এলাকাস্থ সংরক্ষিত বনে প্রায় ২৭০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। বনাঞ্চলের গহিনে তাদের বিচরণ স্বাভাবিক। বনে রোহিঙ্গাদের বিচরণ ও তাদের আবাসস্থল নির্মাণের কারণে বন্যপ্রাণী গহিন বনে নিজেদের আপন ঠিকানা করে নিয়েছেন। তবে অনেক বন্যপ্রাণী অন্যত্রে চলে গেছে। অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে। 

বন ও বনপ্রাণী গবেষকদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লেদা থেকে শালবাগান ও ন্যাচারপার্ক বন পশুপাখির অভয়ারণ্য। উল্লেখিত বনাঞ্চল পশু পাখির খাদ্যস্থল। রোহিঙ্গাদের চলাচলের কারণে পশু-পাখি এখন বনের গহিনে চলে গেলেও তাদের বিচরণ রয়েছে টেকনাফ গেম রিজার্ভের ওই সব এলাকায়।

এএডি/


  বিষয়:   সংরক্ষিত বনে সুউচ্চ বাউন্ডারি 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: