রডের দাম বাড়ছে, প্রভাব পড়বে আবাসন খাতে

সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম

জাতীয়

বিদ্যুতের মূল্য ও ভ্যাট বৃদ্ধির জেরে ইস্পাত শিল্প অস্থির। এতে বাড়ছে নির্মাণ শিল্পের অন্যতম উপকরণ এসএস রডের দাম। বিদ্যুতের মূল্য

2026-06-21T00:31:21+00:00
2026-06-21T00:31:21+00:00
 
  শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
রডের দাম বাড়ছে, প্রভাব পড়বে আবাসন খাতে
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম
প্রকাশ: রোববার, ২১ জুন, ২০২৬, ১২:৩১ এএম 
বাড়ছে নির্মাণ শিল্পের অন্যতম উপকরণ এসএস রডের দাম। ছবি : সংগৃহীত
বিদ্যুতের মূল্য ও ভ্যাট বৃদ্ধির জেরে ইস্পাত শিল্প অস্থির। এতে বাড়ছে নির্মাণ শিল্পের অন্যতম উপকরণ এসএস রডের দাম। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির পরই শুরু হয় রডের দাম বৃদ্ধির তোড়জোড়। 

এরই মধ্যে ঘোষিত বাজেটে ইস্পাত শিল্পের জন্য ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। রি-রোলিং মিল মালিকরা বলছেন, বিদ্যুৎ-ভ্যাট দুই কারণে বেড়েই চলেছে রডের দাম। প্রতি টন ৬০ গ্রেড রডের দাম এখনই ৯০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। বর্ষা শেষে পিক সিজনে দাম লাখ টাকা ছাড়াতে পারে। 

চট্টগ্রাম নগরীর দুই নম্বর গেট ও মুরাদপুর এলাকার ডিলারদের স্টলে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতি টন ৬০ গ্রেড রড বিক্রি হচ্ছে ৯০ হাজার থেকে ৯৫ হাজার টাকা। ৪০ গ্রেডের প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকা। 

তবে আবাসন শিল্পে ৬০ গ্রেডের রডের চাহিদাই বেশি। মিল মালিক ও ডিলাররা বলছেন, বিদ্যুতের দাম হ্রাসের পাশাপাশি ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি টন রডের দাম এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। 

দেশে বার্ষিক এমএস রডের চাহিদা ৫০ লাখ মেটিকটন। রড তৈরি কাঁচামালের একটি অংশ আসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ড থেকে। বেশিরভাগ স্ক্র্যাপ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। স্টিল ও রি-রোলিং মিলে রড তৈরির উপাদান স্ক্যাপের ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশের শিপইয়ার্ড, ভাঙাড়ি শিল্প মিলে রি-রোলিং মিলে স্ক্র্যাপ সরবরাহ আসে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ ভাগ। মেলটিং স্ক্র্যাপ হিসেবেই রি-রোলিং মিলে সরবরাহ করা হয় শিপইয়ার্ডের স্ক্র্যাপ। বিদেশ থেকে আমদানি করা উন্নত মানের স্ক্র্যাপ দিয়ে মিলগুলোতে তৈরি হয় বিলেট। 

বছরে ৫০ লাখ রড উৎপাদন হলেও সক্ষমতা আরও বেশি। দেশের ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল এবং ১৫০টির বেশি রি-রোলিং মিলে উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টন। অধিকাংশ কারখানা বর্তমানের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করছে।

সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করা নিয়ে একজন মিল মালিক বলেন, গেল ছয় বছর ধরে বড় কোনো প্রজেক্ট হাত নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ চার বছরে কোনো প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়নি। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের ২ বছরসহ বর্তমান সরকারের সময়েও বড় প্রজেক্ট বা মেগা প্রজেক্ট নেই। মিল মালিকরা সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করেছিল মেগা প্রজেক্টের কথা বিবেচনা করে। কিন্তু মেগা প্রজেক্ট বন্ধ থাকায় মিলগুলোর সক্ষমতা অর্ধেকের বেশি অব্যবহৃত পড়ে আছে। 


মিল মালিকরা বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তাদের ওপর স্থানান্তর করার পরিকল্পনা নেই। বিক্রি কমে যাওয়ার শঙ্কায় বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ কোম্পানি বহন করবে। বাড়তি ব্যয় বহন করার ফলে ইস্পাত শিল্প রুগ্ন হয়ে পড়বে। কারণ বাড়তি ব্যয় বহন করতে গিয়ে ব্যাংক ঋণের কিস্তি অনিয়মিত হয়ে পড়বে। কারখানার লোকবল কমে গেলে বাড়বে বেকারের সংখ্যা। নানা ধরনের চার্জের কারণে ইস্পাত শিল্প ক্ষতির মুখে আছে জানিয়েছেন বহু কারখানা মালিক। 

তারা বলছেন, ইস্পাত খাতের কারখানাগুলো গ্রিড থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ নিয়ে থাকে। এ জন্য কোনো সিস্টেম লস, ট্রান্সমিশন বা ডিস্ট্রিবিউশন লস নেই। কিন্তু ডিমান্ড চার্জ, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও অন্যান্য মাশুল হিসাব করলে ব্যয় বেড়ে গেছে। বাড়তি ব্যয় এখন ইস্পাত শিল্পের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা।

বিদ্যুৎ বিলের প্রভাবে দাম বাড়বে জানিয়ে মিল মালিকরা বলেন, শুধু বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই উৎপাদন ব্যয় বাড়বে বহুগুণ। প্রতি টন রডের উৎপাদন খরচ অন্তত ১ হাজার ৭৮৫ টাকা বাড়বে। অন্যদিকে জ্বালানি তেল, চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল ও অন্য ব্যয় যুক্ত হলে প্রতি টনে মোট ব্যয় বৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ হাজার ৫৬০ টাকা। 

বিএসএমএর সাবেক সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসাদ সময়ের আলোকে বলেন, ইস্পাত শিল্পে অনেক সম্ভাবনা আছে। এই সম্ভাবনা আলোর মুখ দেখেনি। কখনো শক্তভাবে এগোতে পারেনি। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভ্যাটের জাল আর বিদ্যুতের বাড়তি দাম। এমনিতে ব্যাংক ঋণ পরিশোধসহ নানা ঝামেলার মধ্যে আছে ইস্পাত শিল্প। নতুন দুই সমস্যার কারণে সম্ভাবনাময় শিল্প বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।

তিনি বলেন, সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন কমবে। নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং দেশের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিএসএমএর মহাসচিব সুমন চৌধুরী বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের মতো ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না করলে অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদে চাপ বাড়বে। কারণ ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং পরের অর্থবছরে ৪২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করা দরকার। ক্যাপাসিটি চার্জ বাদ দেওয়া হলে বা নিয়ন্ত্রন হলে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না। 

মিল মালিকরা জানান, চলতি মাসের শুরুতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছে। আর গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বাড়তি বিদ্যুতের দামের বোঝা বহন করা ইস্পাত শিল্পের জন্য কঠিন। 

গত ৮ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ইস্পাত খাতের ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএসএমএ সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের মহাসচিব সুমন চৌধুরী, সাবেক সভাপতি মানোয়ার হোসেন, শেখ মাসাদুল আলমসহ অন্যরা। 

বাজেটে ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব : এদিকে বিদ্যুতের দাম নিয়ে অস্থিরতার মাঝেই ঘোষিত বাজেটে ইস্পাত শিল্পে ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার বলছে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে ইস্পাত শিল্পে বিভিন্ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। গেল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব তুলে ধরেন।

এ সময় তিনি বলেন, ইস্পাত খাতে বিদ্যমান ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে ফেরো অ্যালয়, স্ক্র্যাপ, বিলেট, ইনগট এবং এমএস রড উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে নির্দিষ্ট ভ্যাটের হার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ফেরো-ম্যাঙ্গনিজ ও ফেরো-সিলিকো ম্যাঙ্গনিজ অ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রতি টনে নির্দিষ্ট ভ্যাট ১ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা হবে। 


একইভাবে ফেরো-সিলিকন অ্যালয়ের ক্ষেত্রেও ভ্যাট ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া স্ক্র্যাপ বা শিপ স্ক্র্যাপের ক্ষেত্রে প্রতি টনে নির্দিষ্ট ভ্যাট ১ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ থেকে উৎপাদিত এমএস রডের ওপর ভ্যাট ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ১০০ টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এই ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাবকে ইস্পাত শিল্পের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে মনে করছেন মিল মালিকরা। বিএসএমএর নির্বাহী পরিচালক শামসুল আলম খান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা যখন বিদ্যুতের দাম নিয়ে চিন্তিত তখন বাজেটে ইস্পাত শিল্পে ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্ধিত ভ্যাট কার্যকর হলে প্রতি টন রডের দাম আরও অন্তত দেড় হাজার টাকা বাড়বে। এভাবে সব দিক দিয়ে চেপে ধরলে ইস্পাত শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

ধস নামবে আবাসন খাতে : বাজারে রডের দাম বাড়লেই প্রভাব পড়ে আবাসন শিল্পে। বেশি দামে কেনা রড দিয়ে তৈরি ফ্ল্যাটের দামও বেড়ে যায়। কিন্তু ক্রেতা বাড়তি দামে ফ্ল্যাট কিনতে চায় না। ফলে ফ্ল্যাট বিক্রি নেমে আসে অর্ধেকে। বিক্রি করতে গেলে কম দামে লোকসানে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না।

এ ব্যাপারে রিহ্যাবের পরিচালক আবদুল গাফফার মিয়াজি সময়ের আলোকে বলেন, ৬৫/৭৮ হাজার প্রতি টনের রড এক লাখ টন ছাড়িয়েছিল বহুবার। এখনও দাম চড়া। নির্মাণ শিল্পের অন্যতম উপকরণ এমএস রড। রডের দাম বাড়লে আবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। রডের দাম বৃদ্ধির কারণে নির্মাণ ব্যয় বাড়ে। এতে প্রতি স্কয়ার ফিট ফ্ল্যাটের দামও বেড়ে যায়। কিন্তু বাড়তি দামেতো ক্রেতা ফ্ল্যাট কিনতে চায় না। তাই আমরাও চাই ইস্পাত শিল্পে অস্থিরতা না থাকুক।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   রড  দাম  প্রভাব  পড়া  আবাসন 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: