বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে কিছু ম্যাচ থাকে, যা শুধু তিন পয়েন্টের নয়। বরং ইতিহাস, মর্যাদা আর ভবিষ্যতের লড়াই। গ্রুপ ‘জি’ তে বেলজিয়াম ও ইরান মুখোমুখি সে রকমই এক দ্বৈরথ। লস অ্যাঞ্জেলেসে রোববারের এই ম্যাচে জয় মানে নকআউটের পথে এক পা এগিয়ে যাওয়া, আর হার মানে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়া।
গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ শেষে চার দলই ১ পয়েন্ট করে নিয়ে সমান অবস্থানে রয়েছে। ফলে এই ম্যাচটি কার্যত গ্রুপের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। প্রথম ম্যাচে বেলজিয়াম মিসরের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে। শুরুতেই তারা পিছিয়ে পড়লেও বদলি রোমেলু লুকাকুর চাপেই আত্মঘাতী গোলের মাধ্যমে সমতায় ফেরে। তবে আক্রমণে ধার কম থাকায় জয় অধরা থেকে যায়। অন্যদিকে ইরান নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে আক্রমণভাগে দারুণ ইঙ্গিত দিলেও রক্ষণভাগে দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বেলজিয়াম নবম স্থানে, ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচিত। বাছাইপর্বে ২৪ পয়েন্টের মধ্যে ১৮ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ শীর্ষে থেকে তারা ২৯ গোল করেছে এবং মাত্র ৭ গোল হজম করেছে। তবে বড় মঞ্চে ধারাবাহিকতা না থাকায় প্রশ্নও থেকে গেছে, শেষ তিন বিশ্বকাপ ম্যাচে তারা জয়হীন। ইরান তুলনামূলকভাবে নিচের দিকে থাকলেও এশিয়ার অন্যতম শৃঙ্খলিত ও কঠিন প্রতিপক্ষ। বিশেষ করে তাদের সংগঠিত ডিফেন্স এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক যেকোনো বড় দলের জন্য হুমকি হতে পারে।
হেড টু হেড ইতিহাসে বেলজিয়াম এগিয়ে থাকলেও মুখোমুখি ম্যাচ খুব বেশি হয়নি- তাই অতীত পরিসংখ্যান খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। বেলজিয়ামের বড় শক্তি হলো কেভিন ডি ব্রুইন ও রোমেলু লুকাকুর অভিজ্ঞতা এবং আক্রমণাত্মক গভীরতা। তবে রক্ষণভাগে কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ইরানের ভরসা মেহদি তারেমি, যিনি ষাটের বেশি আন্তর্জাতিক গোল করেছেন এবং দ্রুত উইং প্লে সম্পন্ন ফুটবলার।
সব মিলিয়ে ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে বেলজিয়াম সামান্য এগিয়ে থাকলেও ইরানের লড়াইয়ের মানসিকতা ম্যাচটিকে কঠিন করে তুলবে। তবু সামগ্রিক শক্তি ও ব্যক্তিগত দক্ষতায় এগিয়ে থেকে বেলজিয়ামই এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিন পয়েন্টের ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামছে। ভ্যাংকুভারে মিসর-নিউজিল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ লড়াই ঘিরে তৈরি হয়েছে সমান উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। প্রথম ম্যাচে ড্র করে শুরু করা নিউজিল্যান্ড ও মিসর- দুই দলই এখন দাঁড়িয়ে আছে একই বাস্তবতায়; প্রথম বিশ্বকাপ জয় হাতের নাগালে এনে সেটি ধরে রাখতে না পারার আফসোস। তাই এই ম্যাচ শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, বরং টুর্নামেন্টে টিকে থাকার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও।
নিউজিল্যান্ড এই ম্যাচে নামছে তাদের পরিচিত শক্তি শারীরিকতা, দ্রুত ট্রানজিশন এবং সেট-পিস নির্ভর আক্রমণ নিয়ে। ক্রিস উড এখনও দলের প্রধান ভরসা, যিনি সামনে বল ধরে রাখা এবং গোলের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে শুধু উড-নির্ভরতা নয়, এলিজাহ জাস্টের উত্থান তাদের আক্রমণভাগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইরানের বিপক্ষে তার দুই গোল প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলে তিনি ম্যাচের রং বদলে দিতে পারেন। নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলগত শৃঙ্খলা এবং সহজ কিন্তু কার্যকর ফুটবল, তবে দুর্বলতা হলো ডিফেন্সিভ কনসেন্ট্রেশনের ঘাটতি, বিশেষ করে ম্যাচের শেষ ভাগে।
অন্যদিকে মিসর মাঠে নামছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয় নিয়ে। টেকনিক্যাল দক্ষতা, বল দখল এবং সৃজনশীল আক্রমণ। মোহাম্মদ সালাহ এখনও তাদের সবচেয়ে বড় নাম হলেও তিনি একমাত্র নির্ভরতা নন। এমাম আশুর, ওমর মারমুশ এবং অন্যান্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা দলকে আরও বহুমাত্রিক করেছে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাদের পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, তারা বড় দলের বিপক্ষেও পরিকল্পিতভাবে খেলতে সক্ষম। মিসরের শক্তি হলো মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলা, তবে ফিনিশিংয়ের ধারাবাহিকতা এখনও প্রশ্নের মুখে।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের দিক থেকে মিসর কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বাস্তব পারফরম্যান্সে ব্যবধান খুব বেশি নয়। নিউজিল্যান্ড তুলনামূলক নিচের র্যাংকে থাকলেও তাদের শারীরিক শক্তি ও দ্রুত প্রতিআক্রমণ বড় দলগুলোকেও অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। তাই কাগজে-কলমে মিসর এগিয়ে থাকলেও মাঠের বাস্তবতা অনেক বেশি ব্যালান্সড।
সব মিলিয়ে এই ম্যাচে একদিকে আছে নিউজিল্যান্ডের সরল কিন্তু শক্তিশালী কাঠামো, অন্যদিকে মিসরের টেকনিক্যাল ও বৈচিত্র্যময় আক্রমণ। দুই দলের শক্তির পার্থক্য যতটা স্পষ্ট মনে হয়, বাস্তবে ম্যাচটি ততটাই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি ভুল, একটি মুহূর্তÑ এই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে যথেষ্ট হতে পারে।
সময়ের আলো/এসএকে