২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শুরুটা মোটেও প্রত্যাশামাফিক হয়নি পর্তুগালের। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে তুলনামূলক দুর্বল দল ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র করেছে রবার্তো মার্তিনেজের দল। কিন্তু মাঠের হতাশাজনক ফলাফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় ড্রেসিংরুমের ভেতরের পরিস্থিতি। স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি, দলের ভেতরে মতবিরোধ ও বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
স্প্যানিশ দৈনিক ‘মার্কা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্তুগাল দলে রোনালদোকে ঘিরে দুই ধরনের মত তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ মনে করে, দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও সফল ফুটবলার হিসেবে এখনও শুরুর একাদশে তার জায়গা অটুট থাকা উচিত। অন্যদিকে আরেকটি অংশের বিশ্বাস, ৪১ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ডকে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিট খেলানো ঠিক হয়নি।
এমনকি কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রোনালদোকে কেন্দ্র করে ড্রেসিংরুমে ‘বয়কটের’ আলোচনা পর্যন্ত শুরু হয়েছে। যদিও এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্তুগালের কয়েকজন তারকা ফুটবলার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
বিশেষ করে ব্রুনো ফার্নান্দেস, জোয়াও নেভেস, ভিতিনহা এবং পেদ্রো নেতোর বিরুদ্ধে রোনালদোর প্রতি অসম্মান দেখানো এবং তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন অনেক সমর্থক। তাদের দাবি, সতীর্থরা ইচ্ছাকৃতভাবে রোনালদোকে বল সরবরাহ করছেন না এবং মাঠে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছেন।
এই বিতর্ক আরও উসকে দেন জোয়াও নেভেস। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের একমাত্র গোলদাতা ম্যাচ শেষে রোনালদোকে নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা সবাই জানি ক্রিশ্চিয়ানো জাতীয় দল এবং বিশ্ব ফুটবলের জন্য কী করেছেন।
কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি আলাদা কেউ নন। তিনি আমাদের মতোই দলের একজন খেলোয়াড় এবং সবাই মিলে দলকে সাহায্য করতে এসেছেন।’ নেভেসের এই মন্তব্যকে রোনালদোর অনেক ভক্ত ‘অসম্মানজনক’ হিসেবে দেখছেন।
তাদের অভিযোগ, তরুণ মিডফিল্ডার অধিনায়কের মর্যাদা খাটো করার চেষ্টা করেছেন। যদিও অনেকের মতে, নেভেস কেবল দলগত মানসিকতার কথাই তুলে ধরেছেন।
পর্তুগালের সংবাদমাধ্যম ‘রেকর্ড’-এর উপসম্পাদক ভিতোর পিন্তো অবশ্য পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, ‘এটি জাতীয় দলের ভেতরে একটি গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে। রোনালদোকে নিয়ে যেকোনো সমালোচনার বিপরীতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে এবং সেটিই মূলত মেরুকরণের কারণ।’
তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, জাতীয় দলের ভেতরে রোনালদোর বিরুদ্ধে কোনো সুসংগঠিত বয়কটের প্রমাণ নেই। বরং তার মতে, মূল সমস্যা হচ্ছে পর্তুগাল মাঠে তাদের সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ডকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে না।
এদিকে ডিআর কঙ্গোর খেলোয়াড়দের মন্তব্যও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দলের মিডফিল্ডার নাগাল আয়েল মুকাউ ম্যাচ শেষে বলেন, ‘সত্যি বলতে, রোনালদোকে থামানোর জন্য আমাদের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা ছিল না। কারণ আমরা জানি তিনি আগের মতো নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু আর আগের মতো থাকে না।’
তার এই মন্তব্য পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। কারণ একসময় প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিলেন রোনালদো। এখন প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড় প্রকাশ্যে বলছেন, তাকে থামাতে আলাদা পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়নি।
সমালোচনার আগুনে আরও ঘি ঢেলেছেন রোনালদোর বোন কাতিয়া আভেইরো। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি পোস্টে ‘লাইক’ দিয়েছেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে, ব্রুনো ফার্নান্দেস ও অন্য কয়েকজন খেলোয়াড় ইচ্ছাকৃতভাবে রোনালদোকে পাস দিচ্ছেন না। পরিবারের এমন প্রতিক্রিয়াও ড্রেসিংরুমের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম ‘এ বোলা’ একটি সম্পাদকীয়তে রোনালদোর জাতীয় দলের প্রতি অবদানের প্রশংসা করলেও ইঙ্গিত দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তার বিদায়ের সময় হয়তো চলে এসেছে। ফ্রান্সের কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরিও ফক্স স্পোর্টসে রোনালদোর মুভমেন্ট ও পজিশনিং নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন।
এখন সব নজর আগামী মঙ্গলবারের ম্যাচে। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় উজবেকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামবে পর্তুগাল। প্রথম ম্যাচে কলম্বিয়ার কাছে ৩-১ ব্যবধানে হেরে যাওয়া উজবেকদের বিপক্ষে জয় ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই মার্তিনেজের দলের সামনে।
তবে প্রশ্ন একটাই, মাঠের লড়াইয়ের আগে ড্রেসিংরুমের এই অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে পারবে তো পর্তুগাল? নাকি বিশ্বকাপের মাঝপথেই রোনালদোকে ঘিরে বিভক্তি তাদের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
সময়ের আলো/এসএকে