লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলায় রাজস্ব উন্নয়ন ও এডিপির বিশেষ বরাদ্দের প্রায় ৫৫ লাখ টাকার টেন্ডার নিয়ে হরিলুট ও নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জনগুরুত্বহীন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ এবং সুনির্দিষ্ট কারসাজির মাধ্যমে একই পরিবারকে ৪টি প্যাকেজ পাইয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) আবদুল কাদের মোজাহিদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সচেতন মহলের দাবি, নিজের ব্যবসায়িক পার্টনার ও একটি নির্দিষ্ট পরিবারকে অনৈতিক সুবিধা দিতেই প্রকৌশলী এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ই-টেন্ডার নোটিশ নং- ০৭/২০২৫-২৬ (OTM)’র অধীনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করলে সব ঠিকাদার ৫% কম দরে দরপত্র দাখিল করেন এবং লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে ঠিকাদার নির্বাচিত হন। কিন্তু এই পদ্ধতিতে নিজের পছন্দের পার্টনার কাজ পাবেন না নিশ্চিত জেনে, উপজেলা প্রকৌশলী বারবার বিতর্কিত হওয়া সত্ত্বেও ওটিএম (OTM) বা উন্মুক্ত পদ্ধতি বেছে নেন। ইতোপূর্বে এই কাজগুলো (আর এফ কিউ) বা সীমিত পদ্ধতির মাধ্যমে করা হলেও এবার কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও নিজের পকেট ভারী করার উদ্দেশ্যে ওটিএম করা হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
নয়ছয়ের নেপথ্যে যে ৫টি প্যাকেজ
১. প্যাকেজ-১৪ (TID: 1282494): উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের গেজেটেড টুইন কোয়ার্টার রক্ষণাবেক্ষণ কাজ (মেসার্স গোফরান উদ্দিন)।
২. প্যাকেজ-১৫ (TID: 1282493): উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কার্যালয় রক্ষণাবেক্ষণ কাজ (মেসার্স আনাস এন্টারপ্রাইজ)।
৩. প্যাকেজ-১৬ (TID: 1282492): উপজেলা পরিষদ হলরুমের ফলস সিলিং স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ (মেসার্স ফয়সাল ব্রাদার্স)।
৪. প্যাকেজ-১৭ (TID: 1282491): উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের ডরমিটরি ভবন রক্ষণাবেক্ষণ কাজ।
৫. প্যাকেজ-১৮ (TID: 1282490): হাজিরহাট ইউনিয়ন ভূমি অফিস সংলগ্ন পুকুরের পাড় রক্ষায় প্যালিসাইডিং নির্মাণ কাজ (মেসার্স ফয়সাল ব্রাদার্স)।
অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স ফয়সাল ব্রাদার্স হলো উপজেলা প্রকৌশলীর নিজস্ব ব্যবসায়িক পার্টনারের প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া 'মেসার্স আনাস এন্টারপ্রাইজ' উক্ত পার্টনারের ভাইয়ের এবং 'মেসার্স গোফরান উদ্দিন' তাদের বাবার লাইসেন্স। অর্থাৎ, নাম সর্বস্ব তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ঘুরেফিরে একই পরিবারকে ৪টি প্যাকেজের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ ঠিকাদারদের দাবি, লাইসেন্সগুলো কাগজে-কলমে ভিন্ন হলেও এর মূল নেপথ্যে এবং কাজের আসল মালিক স্বয়ং উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ নিজেই।
আরও জানা যায়, বিগত দিনেও উক্ত ৩টি আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়াভাবে সমস্ত কাজ দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো দলের সাধারণ বা পেশাদার ঠিকাদারদের এ যাবৎ কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। ফ্যাসিবাদ আমলের এই সিন্ডিকেট এখনও বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্ষুব্ধ ঠিকাদার বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ ১৭% পর্যন্ত লেস (কম দর) দিয়েও কাজ পাইনি। অথচ মাত্র ১৩% লেসে তাদের পছন্দের লোককে কাজ দিয়ে দেওয়া হলো। কম লেস দেওয়া মানেই সরকারি অর্থের অপচয় এবং সরাসরি পকেট ভারী করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ।’
এই দরপত্র প্রক্রিয়ার তদারকির দায়িত্বে থাকা ইলেক্ট্রিশিয়ান মো. আশরাফ মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায়সারাভাবে বলেন, ‘কমিটির সিদ্ধান্ত মতেই সব কিছু সম্পন্ন হয়েছে, এখানে আমার কিছু করার নেই।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কমলনগর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) আব্দুল কাদের মোজাহিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (LGED) উজ্জ্বল চৌধুরী বলেন, ‘আমি কমলনগর উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে দেখি কি অবস্থা। তারপর বিস্তারিত জানতে পারব। তদন্তে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে, কমলনগরের সাধারণ ব্যবসায়ী ও সাধারণ ঠিকাদার সমাজ এই ‘পক্ষপাতমূলক ও অনিয়মের’ টেন্ডার অবিলম্বে বাতিল করার জোর দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে, বর্তমান সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করে এই দুর্নীতিগ্রস্ত উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সময়ের আলো/মহু