গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় সরকারি (অর্পিত) সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে প্রায় তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আত্মসাতের অভিযোগ এবং এ নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে রংপুর বিভাগীয় প্রশাসন। রোববার দুপুরে গাইবান্ধা সার্কিট হাউজে এ সংক্রান্ত তদন্ত পরিচালনা করেন রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আশরাফুল ইসলাম।
তদন্তের সময় তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু, যমুনা টিভির প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশসহ স্থানীয় একাধিক সাংবাদিকের বক্তব্য শোনেন এবং তা রেকর্ড করেন। তদন্ত শেষে তিনি বিস্তারিত প্রতিবেদন রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জমা দেবেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
গত ১৮ জুন বৃহস্পতিবার সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাটে অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানা দেখিয়ে অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানে নামেন সময় সংবাদ ও যমুনা টিভির দুই প্রতিবেদক। সাদুল্লাপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয় থেকে পাওয়া দুটি পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন নিয়ে বক্তব্য জানতে তারা এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনের কাছে যান। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় এসিল্যান্ড সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং উগ্র, অপেশাদার আচরণ করেন।
এ ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন দৈনিক সময়ের আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় সাদুল্লাপুরের হাসানপাড়া মৌজায় ১/১ ও ২৩৭ নম্বর বিআরএস খতিয়ানভুক্ত সাবেক ৭৬ ও ১১২ দাগের সাড়ে ছয় শতক জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে জমি ও স্থাপনা বাবদ দুই কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩২ টাকা ৭০ পয়সা ছাড় করা হয় পার্শ্ববর্তী পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর ও তার পরিবারের সদস্যদের অনুকূলে।
অভিযোগ উঠেছে, অধিগ্রহণকৃত এই জমি প্রকৃতপক্ষে অর্পিত সম্পত্তি। একই ইউনিয়নের বাসিন্দা আসাদুল্লাহ ফারুকী এই জমির মালিকানা দাবি করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখায় আগেই আপত্তি দাখিল করেছিলেন। তার অভিযোগ, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে প্রতিপক্ষ জাহাঙ্গীর ও তার পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিপূরণের পুরো অর্থ তুলে নিয়েছেন। ফারুকীর প্রশ্ন, সম্পত্তি অর্পিত হলে কীভাবে এই টাকা পরিশোধ করা হলো।
বিষয়টি জটিল করে তুলেছে ভূমি অফিসের নিজস্ব দুটি পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন। ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাদুল্লাপুরের তৎকালীন এসিল্যান্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সম্পত্তিতে সরকারের কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। অথচ ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল ধাপেরহাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আরেকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সম্পত্তিতে সরকারি স্বার্থ রয়েছে। ভূমি অফিসের কোন প্রতিবেদনটি সঠিক- এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়েই সাংবাদিকদের একাধিকবার এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনের রোষানলে পড়তে হয়।
জানা যায়, গত ২ জুন প্রথমবার এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনের বক্তব্য জানতে গেলে তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লাকে জানানো হলে তিনি খাসজমি সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি তথা সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। কেন বক্তব্য দেওয়া হবে না জানতে চাইলে উল্টো তিনিও এসিল্যান্ডের মতো আচরণের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিয়ে হুমকিসূচক ভাষায় কথা শেষ করেন।
এর ধারাবাহিকতায় গত ১৮ জুন বৃহস্পতিবার ফের এসিল্যান্ডের বক্তব্য নিতে তার কার্যালয়ে যান সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু ও যমুনা টিভির প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ। অভিযোগ অনুযায়ী, সাংবাদিকদের দেখামাত্রই তাদের মোবাইল ফোন জমা রাখার নির্দেশ দেন এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন। প্রশ্ন করা মাত্র তিনি চেয়ার থেকে উঠে আঙুল উঁচিয়ে ধমকাতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে তেড়ে এসে ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সাংবাদিকরা ক্যামেরায় হাত দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং ধমকাতে ধমকাতে কার্যালয় ত্যাগ করেন।
পরদিন ১৯ জুন শুক্রবার এ সংক্রান্ত সচিত্র প্রতিবেদন গণমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত হলে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
প্রতিবেদন প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অর্পিত সম্পত্তি অধিগ্রহণের অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেকেই বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এই প্রেক্ষাপটে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার তদন্তের নির্দেশ দেন, যার ধারাবাহিকতায় রোববার গাইবান্ধা সার্কিট হাউজে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুল ইসলাম সরেজমিন তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে বলে জানা গেছে।
সময়ের আলো/আতা