৩৭ বছর আগে সুগন্ধা নদীর তীরে নির্মিত হয় ঝালকাঠি পৌর বাস টার্মিনাল। নির্মাণের ৩ যুগ অতিবাহিত হলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি এ টার্মিনালে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে টার্মিনালজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ।
যাত্রীদের জন্য অপেক্ষমান কক্ষ থাকলেও সেটি ব্যবহৃত হচ্ছে শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় হিসেবে। নেই আধুনিক পাবলিক টয়লেট, বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় অন্যান্য নাগরিক সুবিধা। ফলে, প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক ও বাসচালকদের। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো টার্মিনাল কাদা ও পানি জমে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনাল থেকে বরিশাল, ভান্ডারিয়া, খুলনা, পিরোজপুর, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটাসহ মোট ৮টি রুটে বাস চলাচল করে। এছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরগুনাসহ দূরপাল্লার বাসও চলাচল করছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী এই টার্মিনাল ব্যবহার করলেও, তাদের জন্য নেই একটি মানসম্মত অপেক্ষমান কক্ষ। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের।
এদিকে, টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথজুড়েও ভাঙাচোরা অবস্থা। বৃষ্টির সময় কাদাপানির কারণে বাস চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং ওঠানামা করতে গিয়ে প্রায়ই যাত্রীদের ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়।
জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ঝালকাঠি পৌর বাস টার্মিনাল নির্মাণ করে। ১৯৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল একতলা একটি ভবনসহ নির্মিত এই টার্মিনালের উদ্বোধন করেন তৎকালীন ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক আলতাফ হোসেন। তবে, উদ্বোধনের পর ৩ যুগ পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালটির উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার, উন্নয়ন বা আধুনিকায়ন হয়নি। বর্তমানে ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বরিশালগামী যাত্রী মাহিনুর বেগম বলেন, ‘ঝালকাঠি বাস টার্মিনালের অবস্থা খুবই খারাপ। বাসে ওঠা-নামার সময় অসংখ্য খানাখন্দের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে পুরো টার্মিনাল কাদায় ভরে যায়। এত বছরেও একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল না হওয়ায় আমরা হতাশ।’
টিকিট কাউন্টার কর্মী হিরু বলেন, ‘প্রতিদিন শত শত যাত্রী এই টার্মিনাল ব্যবহার করেন। কিন্তু অবকাঠামোগত দূরাবস্থার কারণে যাত্রীদের যেমন ভোগান্তি পোহাতে হয়, তেমনি আমাদেরও কাজ করতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। দ্রুত একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে যাত্রীসেবা যেমন উন্নত হবে, তেমনি পরিবহন ব্যবস্থাপনাও অনেক সহজ হবে।’
বাস চালক মো. রিপন বলেন, ‘বাস টার্মিনালের বেহাল অবস্থার কারণে বাসস্ট্যান্ডে বসে প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ইঞ্জিন চেক করা সম্ভব হয় না। টার্মিনালের সর্বত্র খানাখন্দ ও কাদাপানির কারণে গাড়ির নিচে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এতে সামান্য ত্রুটি থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করা যায় না। ফলে, যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সময়মতো বাস চলাচল- উভয়ই বিঘ্নিত হয়।’
ঝালকাঠি জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আনিচুর রহমান তাপু বলেন, ‘পৌরসভা প্রতি বছর বাস টার্মিনাল থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করলেও এর ন্যূনতম সংস্কার করা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে টার্মিনালটি চরম অবহেলায় পড়ে আছে। এতে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকরাও নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ভিমরুলি পেয়ারা বাগানসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন। একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল থাকলে আরও বেশি পর্যটক বাসযোগে আসতে আগ্রহী হতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছি। ঝালকাঠির মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরের জন্য একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক বাস টার্মিনাল এখন সময়ের দাবি। দ্রুত উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হলে যাত্রীসেবার মান বাড়বে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং জেলার সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নয়ন হবে।’
ঝালকাঠি পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. সাহিন সুলতানা বলেন,‘ঝালকাঠি পৌরসভার বাসস্ট্যান্ডকে আধুনিক বাস টার্মিনালে রূপান্তরের লক্ষ্যে উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের সার্ভে ও নকশা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ামাত্রই টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে নির্মাণকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
সময়ের আলো/মহু