স্বামীর দেওয়া ৭০ শতক জমি গায়েব, মানবেতর জীবন ৯০ বছরের সন্ধ্যার

আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতি‌নি‌ধি

সারাদেশ

স্বামীর রেজিস্ট্রি করে দেওয়া ৭০ শতক জমির বৈধ মালিক হয়েও শেষ বয়সে নিজের জমির এক কোণে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন

2026-06-22T09:21:10+00:00
2026-06-22T09:21:10+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
স্বামীর দেওয়া ৭০ শতক জমি গায়েব, মানবেতর জীবন ৯০ বছরের সন্ধ্যার
আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতি‌নি‌ধি
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬, ৯:২১ এএম 
নিজের জমির এক কোণে ঝুপড়ি ঘরে সন্ধ্যা রানী। ছবি : সময়ের আলো
স্বামীর রেজিস্ট্রি করে দেওয়া ৭০ শতক জমির বৈধ মালিক হয়েও শেষ বয়সে নিজের জমির এক কোণে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন চুয়াডাঙ্গা আলমডাঙ্গার বেলগাছী পালপাড়ার ৯০ বছর বয়সী সন্ধ্যা রানী। ভূমি রেকর্ডে জমিটি এখন অন্যের নামে। জমি ফেরত পেতে আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে ঘুরছেন তিনি।

অভিযোগ উঠেছে, সন্ধ্যা রানীর অজান্তে ও সন্দেহজনক দলিলের সূত্র ধরে তার জমি অন্যের নামে রেজিস্ট্রি, খারিজ এবং পরে বিক্রি করা হয়েছে। বিশেষ করে, যে নারীর নামে ১৯৭৫ সালে জমি কেনার দলিল দেখানো হয়েছে, তার প্রকৃত জন্মসালও ১৯৭৫—এমন দাবি সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

স্থানীয় সূত্র ও নথিপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, বেলগাছী গ্রামের নিতাই পাল ১৯৮২ সালে তার স্ত্রী সন্ধ্যা রানীর নামে ৭০ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। নিতাই পাল ১৯৮৫ সালের দিকে মারা যান। এরপর দীর্ঘদিন সন্ধ্যা রানী ওই জমির মালিক হিসেবে খাজনা পরিশোধ করে আসছিলেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালেও তার নামে খাজনা পরিশোধের তথ্য রয়েছে।

তবে ২০১৭-১৮ সালের দিকে পুনরায় খাজনা দিতে গিয়ে সন্ধ্যা রানী জানতে পারেন, জমিটি আর তার নামে নেই। ভূমি রেকর্ডে জমির মালিক হিসেবে একই গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলামের নাম দেখা যায়। এতে হতবাক হয়ে পড়েন বৃদ্ধা।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাইফুল ইসলাম ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর তার বোন রুশিয়া খাতুনের কাছ থেকে ওই জমি রেজিস্ট্রি করে নেন। নথিতে রুশিয়া খাতুন ১৯৭৫ সালে নিতাই পালের কাছ থেকে জমিটি কিনেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু রুশিয়া খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, তার প্রকৃত জন্ম ১৯৭৫ সালে। জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুলবশত তার জন্মসাল ১৯৬৫ লেখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, আমি কোনো জমি কিনিনি। এ জমির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।

রুশিয়া খাতুনের ছেলে মোবাইল ফোনে বলেন, আগে কীভাবে হয়েছে, তা বলতে পারব না। পরে জেনেছি, মায়ের নামে জমি রেজিস্ট্রি ছিল। কীভাবে হয়েছে, জানি না। সন্ধ্যা রানীর সঙ্গে এমনটা হওয়া উচিত হয়নি।

পরে সাইফুল ইসলাম জমিটি নিজের নামে খারিজ করে নেন। এরপর ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি পোয়ামারি গ্রামের হেলাল উদ্দিনের ছেলে জেলা প‌রিষ‌দের পলা‌য়িত সদস‌্য মজনু ওরফে ঝান্টুর কাছে জমিটি বিক্রি করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এ ঘটনায় সন্ধ্যা রানী ২০২২ সালে আদালতে একটি পিটিশন মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে আলমডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশীষ কুমার বসুর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়। তিনি পৌর ও বেলগাছী ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।

তবে সন্ধ্যা রানীর পক্ষের অভিযোগ, দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে রুশিয়া খাতুন, সাইফুল ইসলাম ও বর্তমান ক্রেতা মজনুর পক্ষেই মতামত দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়‌নি।

স্থানীয় এক যুবক জানান, সন্ধ্যা রানীর অসহায় অবস্থা দেখে গ্রামের কয়েকজন যুবক তার জন্য একটি ঘর ও টিউবওয়েল নির্মাণ করে দিতে উদ্যোগ নেন। কিন্তু সাইফুল ও মজনুর পক্ষের লোকজন বাধা দেওয়ায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঝুপড়ি ঘরে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সন্ধ্যা রানী বলেন, আমার কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। একটি সন্তান ছিল, সেও অনেক আগে মারা গেছে। স্বামী আমার নামে জমি লিখে দিয়ে গেছেন। আমি কোনোদিন জমি বিক্রি করিনি, রেজিস্ট্রি অফিসেও যাইনি। এখন নিজের জমির এক কোণে ঝুপড়ি তুলে থাকি। মরার আগে শুধু স্বামীর দেওয়া জমিটুকু ফেরত চাই।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন নিরক্ষর ও অসহায় নারীর নামে থাকা জমি কীভাবে অন্যের নামে দলিল, খারিজ ও বিক্রির পর্যায়ে গেল? জন্মসালের সঙ্গে দলিলের অসংগতি, মালিকানা পরিবর্তনের নথি এবং সন্ধ্যা রানীর অভিযোগ— সব মিলিয়ে বিষয়টি নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। যেহেতু বৃদ্ধা সন্ধ্যা রাণীর কোনো সন্তান কিংবা আত্মীয় নেই, সে কারণে প্রশাসন নিজ উদ্যোগে এ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নেবে - এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   স্বামীর দেওয়া  জমি গায়েব  মানবেতর জীবন  সন্ধ্যা রানী 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: