গ্রামের নাম গড়মাটি বলতে গেলে বলতে হয় বরমাটি। কারণ এই গ্রামটি রীতিমতো বরের ঘাঁটি। ২ শতাধিক ঘরজামাইয়ের বসবাস রয়েছে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গড়মাটি গ্রামে।
শ্বশুরবাড়িতে জামাইরা নিয়মিত বসবাস করলে অথবা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যে জামাই স্থায়ীভাবে বসবাস করে তাকেই ঘরজামাই বলা হয়। পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শ্বশুরবাড়ির আর্থিক স্বচ্ছলতাসহ সর্বোচ্চ শ্বশুর বাড়ির লোকজনের আন্তরিকতায় মুগ্ধ ও সন্তুষ্ট হয়ে জামাইরা বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতেই থেকে যায়। অনেকেই ঘরজামাই থাকার লক্ষ্যেই এই গড়মাটি গ্রামে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে আসে।
শুনতে অবিশ্বাস্য বা রূপকথার মতো মনে হলেও, এই গড়মাটি গ্রামে বর্তমানে বসবাস করছেন দুই শতাধিক ঘরজামাই! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। বিয়ের পর যেখানে কনের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার নিয়ম, সেখানে এই গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে আসন গেড়েছেন শত শত জামাইবাবু।
সাধারণত বাঙালি সমাজে ‘ঘরজামাই’ শব্দটির সাথে কিছুটা সংকোচ বা সামাজিক জড়তা জড়িয়ে থাকে। কিন্তু গড়মাটি গ্রামের গল্পটা একেবারেই উল্টো। এখানে ঘরজামাই হওয়াটা কোনো সংকোচের নয়, বরং পরম আনন্দ ও গর্বের। কিন্তু কী এমন জাদু আছে এই গ্রামে, যার কারণে যুবকেরা এখানে বিয়ে করার পর আর নিজের বাড়ি ফিরে যেতে চান না?
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেল এক অদ্ভুত ও সুন্দর সত্য। তাদের মতে, গড়মাটি গ্রামের মূল আকর্ষণ হলো এখানকার মানুষের অবারিত শান্তিপ্রিয়তা এবং অতুলনীয় আতিথেয়তা।
গ্রামে বসবাসকারী কয়েকজন ঘরজামাইয়ের সাথে কথা বললে তাদের চোখে-মুখেও তৃপ্তির হাসি দেখা যায়। তাদের একজন জানান, শুরুতে একটু দ্বিধা ছিল। কিন্তু এখানকার মানুষ এত ভালো যে, কখনো মনেই হয়নি আমি নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও আছি। এখানকার শান্তিময় পরিবেশ আর সবার মেলবন্ধন আমাকে এখানেই স্থায়ী হতে বাধ্য করেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কৃষিকাজ—সবক্ষেত্রেই গ্রামের অন্য যুবকদের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান পান এই জামাইরা। ফলে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনেও তারা বুক ফুলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
গড়মাটি গ্রাম প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ভালোবাসা, শান্তি আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকলে যেকোনো সামাজিক প্রথাকেও কতখানি আনন্দময় ও সহজ করে তোলা যায়। যেখানে আধুনিক বিশ্বে মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে, সেখানে বড়াইগ্রামের গড়মাটি গ্রাম 'ঘরজামাইদের মিলনমেলা' বানিয়ে এক অনন্য সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুস ছামাদ জানান, এই গ্রামের মানুষজন অনেক আন্তরিক। এই গ্রামের মেয়েগুলোর আচার আচরণ চমৎকার। যার ফলে এই গ্রামে বিয়ে করে সংসার স্থায়ী করতে আপত্তি করেননা নব বিবাহিত যুবকরা। বিয়ে পরবর্তী অশান্তি বা তালাকের ঘটনাও তেমন নেই।
সময়ের আলো/আতা