ফুটবল ইতিহাসে বার্ট প্যাটেনডের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারণ, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিকের স্বীকৃতি পেয়েছেন নিজের মৃত্যুর বহু বছর পরে।
১৯৩০ সালের ১৭ জুলাই উরুগুয়ের মন্টেভিডিওর এস্তাদিও পার্কে সেন্ট্রালে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে মাঠে নামেন ২০ বছর বয়সী প্যাটেনড। সেদিন তিনটি গোল করে তিনি দলকে ৩-০ ব্যবধানের জয় এনে দেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ফিফার নথিতে তার এই কীর্তি ভুলভাবে লিপিবদ্ধ ছিল।
ফলে প্রায় ৭৬ বছর ধরে বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকের রেকর্ডটি আর্জেন্টিনার গুইলারমো স্ট্যাবিলের নামে ছিল। অথচ স্ট্যাবিলে তার হ্যাটট্রিক করেছিলেন প্যাটেনডের দুই দিন পরে।
অবশেষে ২০০৬ সালের নভেম্বরে ফিফা নিজেদের ভুল সংশোধন করে বার্ট প্যাটেনডকেই বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিককারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মজার বিষয় হলো, প্যাটেনডের মৃত্যুর ৩২ বছর পর তার পরিবার এই খবর জানতে পারে।
১৯০৯ সালের নভেম্বরে ম্যাসাচুসেটসের ফল রিভারে জন্ম নেওয়া প্যাটেনড মাত্র ১৪ বছর বয়সে ফুটবল খেলা শুরু করেন। বিলি গনসালভেসের সঙ্গে তার দুর্দান্ত জুটি গড়ে ওঠে। ১৯২৮ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে ফল রিভার মার্কসম্যানের হয়ে তিনটি আমেরিকান সকার লীগ শিরোপা জেতেন তিনি।
ক্লাবটির হয়ে ১১৪ ম্যাচে ১১২ গোল করেছিলেন প্যাটেনড। আমেরিকান সকার ইতিহাসবিদ জেমস ব্রাউনের ভাষায়, তিনি ছিলেন ‘গোল করার এক মেশিন’।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে কোনো বাছাইপর্ব ছিল না। আমন্ত্রণভিত্তিক সেই টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত অংশ নেয় মাত্র ১৩টি দেশ। ইউরোপ থেকে খেলেছিল কেবল বেলজিয়াম, ফ্রান্স, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া।
যুক্তরাষ্ট্র দল নিউ জার্সি থেকে জাহাজে করে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে উরুগুয়ে পৌঁছায়। প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামকে ৩-০ গোলে হারানোর পর প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই আসে প্যাটেনডের ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক।
ম্যাচের ১০ ও ১৫ মিনিটে দুটি গোল করেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তৃতীয় গোল করে পূর্ণ করেন নিজের হ্যাটট্রিক। কিন্তু ফিফার রিপোর্টে দ্বিতীয় গোলটি ভুলবশত অধিনায়ক টম ফ্লোরির নামে লিপিবদ্ধ হয়। অন্য একটি প্রতিবেদনে সেটিকে আত্মঘাতী গোল বলা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই শুরু হয় বিভ্রান্তি।
বহু বছর পর আমেরিকান সকার ইতিহাসবিদ কলিন জোস বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং নথিপত্র সংগ্রহ করে একটি ডসিয়ার তৈরি করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি তা ফিফার কাছে পাঠান।
দীর্ঘ তদন্তের পর ফিফা স্বীকার করে, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তিনটি গোলই করেছিলেন বার্ট প্যাটেনড। এর মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকের প্রকৃত স্বীকৃতি ফিরে পান তিনি।
১৯৩০ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র সেমিফাইনালে উঠলেও আর্জেন্টিনার কাছে ৬-১ গোলে হেরে যায়। পরে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে প্যাটেনড আরও দুটি গোল করেন। দক্ষিণ আমেরিকা সফরে চার আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ছয়ে। এরপর আর কখনো জাতীয় দলের হয়ে খেলেননি তিনি।
১৯৩৬ সালে ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে নিজ শহর ফল রিভারে চিত্রশিল্পী ও ওয়ালপেপার মিস্ত্রি হিসেবে কাজ শুরু করেন। নিজের কীর্তি নিয়ে খুব একটা কথা বলতেন না।
তবে ১৯৭০ বিশ্বকাপের সময় একটি প্রতিবেদনে যখন দাবি করা হয় যে পশ্চিম জার্মানির গের্ড মুলার প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক করেছেন, তখন তিনি প্রতিবাদ জানান। বন্ধুরা তাকে সত্যটি প্রকাশ্যে তুলে ধরতে উৎসাহিত করেছিলেন।
১৯৭৪ সালের ৪ নভেম্বর, নিজের ৬৫তম জন্মদিনেই মৃত্যুবরণ করেন বার্ট প্যাটেনড। অথচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিকের নায়ক হওয়া সত্ত্বেও তার নামে মন্টেভিডিও কিংবা নিজ শহর ফল রিভারে আজও কোনো স্মারক নেই।
আগামী ২০৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্ণ হবে। ইতিহাসবিদদের মতে, বার্ট প্যাটেনড ও তার সতীর্থ বিলি গনসালভেসের অবদান স্মরণে তাদের জন্য একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা উচিত।
সময়ের আলো/এসএকে