বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা হ্যারি কেনের মতো তারকারা নিজেদের স্বকীয়তায় আলো ছড়াচ্ছেন। কেউ খুঁজে নেন খেলার ছন্দ, কেউ গতির ঝড় তোলেন, কেউ ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে ভেঙে দেন। কিন্তু এদের সবার মাঝেও একজন যেন আলাদা গ্রহের ফুটবলার। তার নাম আর্লিং ব্রাউট হালান্ড। তিনি যেন ফুটবল খেলেন নিজের নিয়মে, নিজের ছন্দে। তাই প্রশ্নটা আবারও সামনে আসে, হালান্ড কি সত্যিই একজন ‘রোবট’?
প্রশ্নটি শুনতে হয়তো মজা লাগে, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচের পর সেটি নতুন করে আলোচনায় চলে আসে। কারণ হালান্ডের মতো গোল করার ক্ষমতা আধুনিক ফুটবলে খুব কমই দেখা গেছে। প্রায় দুই মিটার উচ্চতার এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার মাঠে নামলেই মনে হয় উত্তর ইউরোপের কোনো ঝড় নেমে এসেছে। তার শারীরিক শক্তি, গতি এবং উপস্থিতিই যেকোনো রক্ষণভাগকে আতঙ্কে ফেলে দেয়। তবে হালান্ডকে অসাধারণ করে তুলেছে শুধু তার শরীর নয়, বলের সঙ্গে তার রহস্যময় সম্পর্ক। আর এই হালান্ড নামক কঠিন বাধা অপেক্ষা করছে ফ্রান্সের সামনে। গ্রুপপর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচেই দেখা হবে দুদলের।
আধুনিক ফুটবলে একজন ফরোয়ার্ডকে সবসময় খেলায় যুক্ত থাকতে হয়, নিচে নেমে বল নিতে হয়, আক্রমণ গড়তে হয়, প্রেসিং করতে হয়। কিন্তু হালান্ড যেন এসব নিয়ম মানতেই রাজি নন। তিনি দীর্ঘ সময় ম্যাচের বাইরে থাকেন, যেন অদৃশ্য হয়ে যান। কিন্তু শিকারি যেমন সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকে, তেমনি সুযোগ পেলেই তিনি আঘাত করেন। আর তখন প্রতিপক্ষের জন্য সবকিছু অনেক দেরি হয়ে যায়।
মজার বিষয় হলো, নিজের এই অবিশ্বাস্য গোল করার রহস্যের ব্যাখ্যাও দিতে পারেন না হালান্ড নিজেই, ‘আমি শুধু গোল করতে খুব ভালো পারি এবং একটু ভাগ্যও আমার সঙ্গে থাকে। আমি ঠিক কী করি, সেটা আমিও জানি না। কিন্তু ব্যাপারটা এমনই।’
বহু বছর ধরেই বলা হচ্ছিল, ক্ল্যাসিক নাম্বার নাইনদের যুগ শেষ। আধুনিক ফুটবলে শুধু গোল করলেই চলবে না, আক্রমণ তৈরিতেও সমান ভূমিকা রাখতে হবে। কিন্তু নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন হালান্ড। প্রথম দুই ম্যাচেই তিনি করেছেন চার গোল। সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য হলেও তার চেয়েও বিস্ময়কর হলো তিনি কীভাবে এই গোলগুলো করেছেন।
ইরাকের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিষেকে মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করে দুটি গোল করেন হালান্ড। এরপর সেনেগালের বিপক্ষেও একই গল্প। প্রথমার্ধে তিনি প্রায় অদৃশ্য ছিলেন, বল স্পর্শ করেছিলেন মাত্র ১১ বার। দ্বিতীয়ার্ধে আবারও সামান্য কয়েকটি সুযোগ পেয়েই জোড়া গোল করেন। পুরো ম্যাচে তার বল স্পর্শের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৩।
অর্থাৎ দুই ম্যাচ মিলিয়ে মাত্র ৪৮ বার বল ছুঁয়ে চার গোল। প্রতি ১২ বার বল স্পর্শে একটি গোল। সংখ্যাটা ভিডিও গেমের মতো শোনালেও বাস্তবে সেটিই করে দেখাচ্ছেন হালান্ড। এখন তিনি চার গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন।
হালান্ড নিজেও গোলের এই রহস্য নিয়ে খুব বেশি ভাবেন না, ‘সত্যি বলতে এখন এসব নিয়ে খুব একটা ভাবছি না। আমরা পরের রাউন্ডে উঠেছি, এটিই অসাধারণ। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে আমি খুব চিন্তা করছি না। তারা হয়তো আমাদের হারাবে, এমনকি পুরো টুর্নামেন্টও জিততে পারে।’
বিশ্বকাপ শুরুর আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মেসি ও এমবাপে। ৩৮ বছর বয়সে আরেকটি মহাকাব্যিক বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখছিলেন মেসি, আর এমবাপেকে ধরা হচ্ছিল বিশ্ব ফুটবলের পরবর্তী রাজা হিসেবে। কিন্তু সেই আলোচনার মাঝখানে হঠাৎই আবির্ভাব ঘটেছে নরওয়ের এই দৈত্যের।
সময়ের আলো/এসএকে