সাংবাদিকদের সঙ্গে উগ্র আচরণ করে বুম-ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা, প্রশ্নের জবাব না দিয়ে অফিস ছেড়ে পালানো এসব কাণ্ডের জেরে অবশেষে বদলি হলেন গাইবান্ধা সাদুল্লাপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জসিম উদ্দিন। বুধবার (২৪ জুন) সিনিয়র সহকারী কমিশনার উত্তম কুমার দাশ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাঁকে পঞ্চগড়ের বোদায় বদলি করা হয়েছে।
তবে বদলির এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ কেবল একটি ঘটনার আংশিক পরিণতি। মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে উত্তরের অপেক্ষায়, সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাটের হাসানপাড়া মৌজায় অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে প্রায় তিন কোটি টাকা কীভাবে তুলে নেওয়া হলো এবং ভূমি অফিসের দুটি পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনের পেছনে কার স্বার্থ কাজ করেছে।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ছয়লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় হাসানপাড়া মৌজার ১/১ ও ২৩৭ বিআরএস খতিয়ানের সাবেক ৭৬ ও ১১২ হাল দাগে সাড়ে ছয় শতক জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩২ টাকা ৭০ পয়সা পরিশোধ করা হয় পার্শ্ববর্তী উপজেলা পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই জমি আসলে অর্পিত সম্পত্তি, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। একই ইউনিয়নের বাসিন্দা আসাদুল্লাহ ফারুকী জেলা প্রশাসকের এলএ শাখায় এ বিষয়ে লিখিত আপত্তিও দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে জাহাঙ্গীর ও তাঁর পরিবার এই অর্থ তুলে নিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সম্পত্তি যদি অর্পিতই হয়, তাহলে কীভাবে ব্যক্তির নামে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ হলো?’
এই অভিযোগকে আরও জটিল করে তুলেছে ভূমি অফিসের দুটি সাংঘর্ষিক দাপ্তরিক প্রতিবেদন। ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাদুল্লাপুর এসিল্যান্ড এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেন, উক্ত সম্পত্তিতে সরকারের কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। অথচ ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল ধাপেরহাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্পত্তিটিতে সরকারি স্বার্থ জড়িত আছে। একই জমি নিয়ে সরকারি দপ্তরের দুটি বিপরীত অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে— কোন প্রতিবেদনটি সত্য, আর কোনটি কার স্বার্থে রচিত?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গত ২ জুন সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনের বক্তব্য নিতে যান। সেদিনই প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন তিনি। ঘটনা জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লাকে তাৎক্ষণিকভাবে মুঠোফোনে জানানো হলে তিনি খাস জমি সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ও সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।
ইউএনও মাহমুদুল হাসানের কাছে গেলে তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। উল্টো হুমকির সুরে বলেন, ‘আমি কোনো বক্তব্য দেব না— এটা জেলা প্রশাসককে জানান।’ সাংবাদিককে কেন কথা বলা যাবে না জানতে চাইলে তিনি এসিল্যান্ডের মতো আচরণের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেন।
এরপর বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ আবারও এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনের অফিসে যান। দুজন সাংবাদিককে দেখামাত্রই মোবাইল ফোন জমা রাখার নির্দেশ দেন জসিম উদ্দিন। প্রশ্ন করতেই চেয়ার থেকে উঠে আঙুল তুলে ধমকাতে শুরু করেন। পুনরায় প্রশ্ন করলে তেড়ে এসে চিৎকার করেন, ‘এটা কি ফাজলামির জায়গা?’ এবং ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সাংবাদিকরা ক্যামেরায় হাত দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে আরও ধমকিয়ে বলেন, ‘এটা কি রেকর্ডের জায়গা? যান, চলে যান।’ এরপর গাড়িতে উঠে অফিস ত্যাগ করেন।
পরদিন শুক্রবার (১৯ জুন) সময় সংবাদ ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার করে। এতে হাসানপাড়া মৌজার অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে উপস্থাপন করে প্রায় তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ গ্রহণের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এবং ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার তদন্তের নির্দেশ দেন। গত ২১ জুন রোববার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুল ইসলাম গাইবান্ধা সার্কিট হাউজে সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু, যমুনা টিভির প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের বক্তব্য শোনেন এবং লিপিবদ্ধ করেন। তবে তদন্ত রিপোর্ট আজ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তদন্তের ঠিক পরদিন সোমবার (২২ জুন) এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন নিজেই হাসানপাড়া মৌজার প্রশ্নবিদ্ধ জমিটিকে অর্পিত সম্পত্তি চিহ্নিত করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন। ইতিমধ্যে যে জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ কোটি কোটি টাকা পরিশোধ হয়ে গেছে, সেই জমিতে এই সাইনবোর্ড লাগানোর তাৎপর্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে।
বুধবার (২৪ জুন) অফিস আদেশের মাধ্যমে জসিম উদ্দিনকে পঞ্চগড়ের বোদায় বদলি করা হয়েছে। সাংবাদিক মহল ও সচেতন নাগরিকরা এই পদক্ষেপকে আংশিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখলেও মূল দাবি হলো অর্পিত সম্পত্তি কেলেঙ্কারির পূর্ণ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। শুধু বদলি নয়, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন মূল প্রত্যাশা।
তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় না আনা পর্যন্ত এই ঘটনা গাইবান্ধার ভূমি প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়েই থাকবে।
সময়ের আলো/আতা