আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ : প্রভাব বিস্তারের নতুন ছক কষছে চীন-পাকিস্তান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

চীন ও পাকিস্তান তাদের ‘অল-ওয়েদার স্ট্র্যাটেজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশিপ’-কে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা যাচাই করছে

2026-06-25T10:41:08+00:00
2026-06-25T10:41:23+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ : প্রভাব বিস্তারের নতুন ছক কষছে চীন-পাকিস্তান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১০:৪১ এএম  আপডেট: ২৫.০৬.২০২৬ ১০:৪১ এএম
চীন-পাকিস্তান প্লাস মডেল আঞ্চলিক রাজনীতিকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটা ভাবনার বিষয়। ছবি : এআই
চীন ও পাকিস্তান তাদের ‘অল-ওয়েদার স্ট্র্যাটেজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশিপ’-কে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা যাচাই করছে বলে মনে হচ্ছে। এর স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে বিভিন্ন বহুপাক্ষিক উদ্যোগে, যেমন চীন-আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংলাপ, নতুন বাংলাদেশ-চীন-পাকিস্তান সহযোগিতা প্রক্রিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সমন্বয়ে।

এ ধরনের উদ্যোগকে ‘চীন-পাকিস্তান প্লাস’ মডেল বলা যেতে পারে। তবে এ ধারণাকে কোনো নতুন জোট বা স্থায়ী আঞ্চলিক কাঠামো হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি বেইজিং ও ইসলামাবাদের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বকে ভিত্তি করে নির্দিষ্ট কিছু তৃতীয় পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করার নমনীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

এ প্রবণতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে আফগানিস্তানকে ঘিরে গড়ে ওঠা ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। কাবুল ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির; সীমান্ত উত্তেজনা, সহিংসতা এবং পরস্পরের প্রতি কঠোর বক্তব্য প্রায়ই দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন-আফগানিস্তান-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর গুরুত্ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ ২০১৫ সালে আরও শক্তিশালী রূপ পায় এবং ২০১৭ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।


২০২৫ সালের মে মাসে বেইজিং জানায় যে, কাবুল ও ইসলামাবাদ নীতিগতভাবে রাষ্ট্রদূত বিনিময়ে সম্মত হয়েছে। একইসঙ্গে এই ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া আফগানিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনাকেও এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে, দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত না হলেও তিন দেশের প্রতিনিধিরা চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে সপ্তাহব্যাপী অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নেন, যা সংলাপ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।

তবে চীন-আফগানিস্তান-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় কাঠামো পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি। এর প্রকৃত গুরুত্ব বরং অন্য জায়গায়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন অচলাবস্থায় পড়ে, তখন এটি সংলাপ ও যোগাযোগের একটি বিকল্প কূটনৈতিক পথ খোলা রাখে। চীনের দৃষ্টিতে এই কাঠামোর গুরুত্ব হলো, এর মাধ্যমে বেইজিং সরাসরি কোনো নিরাপত্তা দায়িত্ব না নিয়েই তার পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। পাকিস্তানের জন্য এটি আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে কাবুলের সঙ্গে আলোচনা ও চাপ প্রয়োগের কূটনৈতিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, সীমিত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এ কারণেই চীন-আফগানিস্তান-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় কাঠামোকে ‘চীন-পাকিস্তান প্লাস’ ধারণার সবচেয়ে কার্যকর উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক জোট নয়; বরং একটি নমনীয় ও বাস্তবধর্মী অংশীদারত্ব, যা মতপার্থক্য ও উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংলাপের ধারায় রাখার চেষ্টা করে।

একই ধরনের ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায় ২০২৫ সালের জুনে কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম বাংলাদেশ-চীন-পাকিস্তান বৈঠকেও। ওই বৈঠকে তিন দেশ সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের বিষয়ে একমত হয়। তবে আফগানিস্তান-কেন্দ্রিক ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর বিপরীতে এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কোনো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা নয়। বরং এটি এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপ দীর্ঘ ১৫ বছর পর পুনরায় সক্রিয় হয়েছে।


ঢাকা নিজেকে কোনো চীন-পাকিস্তানকেন্দ্রিক জোটের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে অনাগ্রহী হতে পারে। তবু বেইজিং ও ইসলামাবাদ সম্ভবত যাচাই করে দেখছে, সীমিত ঝুঁকির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের বিদ্যমান অংশীদারিত্বকে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব কি না।

মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতেও চীন ও পাকিস্তানের সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। চলতি বছরের মার্চে ইরান সংকট নিরসনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তান প্রথমে নিজস্ব কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। এরপর একই মাসে বেইজিংয়ে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পাঁচ দফা উদ্যোগ ঘোষণা করে।

পৃথকভাবে দেখলে এই উদ্যোগে খুব নতুন কিছু ছিল না; এর ভাষা মূলত প্রচলিত কূটনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন। তবে এর তাৎপর্য নিহিত ছিল ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায়। পাকিস্তান এখানে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক যোগাযোগ এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়েছে এবং চীন সেই প্রচেষ্টাকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছে।


অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবশ্য এই সহযোগিতার পরিধি এখনও সীমিত। চীন ও পাকিস্তান বহুবার চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-এ তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এটিকে উন্মুক্ত আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু অর্থায়ন সংকট, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি, পাকিস্তানের দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং বেইজিংয়ের কঠোর মানদণ্ডের কারণে অনেক বড় প্রকল্প প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত চীন-পাকিস্তান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। সেখানে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, সিপিইসি ২.০ এবং জাতিসংঘ ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (এসসিও) সমন্বয়ের বিষয়গুলোকে একই আলোচনা কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। যদিও এটিকে এখনই কোনো সুসংহত আঞ্চলিক কৌশল বলা যাবে না, তবুও এটি স্পষ্ট করে যে বেইজিং ও ইসলামাবাদ তাদের সম্পর্ককে কেবল দ্বিপক্ষীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। এ ধারার অংশ হিসেবেই পাকিস্তান-চীন সমর্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মিডিয়েশন’-এর মতো উদ্যোগকে সমর্থন করেছে এবং বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রেখেছে।

তবে ‘চীন-পাকিস্তান প্লাস’ ধারণার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগগুলো কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ পায় তার ওপর। পাকিস্তানে চীনা নাগরিকদের ওপর হামলা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে চলমান সহিংসতা এবং উগ্রবাদ বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বেইজিংকে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক করে তুলতে পারে। একইভাবে, সিপিইসিতে তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণ তখনই অর্থবহ হবে, যখন শিল্প, খনিজ, পরিবহন ও জ্বালানি খাতের প্রকল্পগুলো আলোচনা থেকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাবে।


এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে সৌদি আরবের অংশগ্রহণ। পাকিস্তানের নতুন ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে সৌদি আরব সিপিইসিতে বিনিয়োগ বা সম্পৃক্ততার আগ্রহ বাস্তবে কতটা রূপ পায়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে প্রতিরক্ষা ও সংবেদনশীল প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট খাতে তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণের বিষয়ে চীন সতর্ক অবস্থান বজায় রাখবে, কারণ এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি রয়েছে।

চ্যালেঞ্জগুলো শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ওপর নির্ভরশীলতা এবং একইসঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা যেকোনও একক আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের কার্যকারিতাকে সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য অংশীদার দেশগুলোও নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইবে এবং শুধুমাত্র পারস্পরিক স্বার্থের ক্ষেত্রেই চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা করবে।

ফলে ‘চীন-পাকিস্তান প্লাস’ আরও কার্যকর ও টেকসই রূপ পেতে হলে নিয়মিত ফলো-আপ ব্যবস্থা, দৃশ্যমান প্রকল্প বাস্তবায়ন, চীনা কর্মীদের জন্য নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা এবং তৃতীয় পক্ষের জন্য পর্যাপ্ত কূটনৈতিক নমনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করা জরুরি যে, এই ধরনের সহযোগিতায় যুক্ত হওয়ার অর্থ কোনো আনুষ্ঠানিক জোটে যোগ দেওয়া নয়।

‘চীন-পাকিস্তান প্লাস’ রাতারাতি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি পাল্টে দেবে না। তবে এমন এক সময়ে, যখন বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই ধীরগতির এবং আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় ক্রমশ বাড়ছে, তখন এটি মধ্যম ও পরাশক্তিগুলোর জন্য নমনীয়, বিষয়ভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি সম্ভাব্য মডেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

(লাউশেয়ার্স ফান্ড অ্যান্ড হরাইজন ২০৪৫-এর নিউক্লিয়ার ফিউচার্স ফেলোর এই নিবন্ধটি ইস্টএশিয়া ফোরাম থেকে অনূদিত)

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   আফগানিস্তান  বাংলাদেশ  প্রভাব  বিস্তার  চীন  পাকিস্তান  প্লাস মডেল 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: