ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিতের একযুগেও বহাল তবিয়তে যাদুঘর-আদালত

মোফাজ্জেল হোসাইন, বরিশাল

সারাদেশ

বরিশালে ৩৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন গত এক যুগেও অপসারণ করা যায়নি। ২০১৪ সালে এসব ভবনকে ব্যবহারের অনুপযোগী এবং পরিত্যক্ত ঘোষণা করা

2026-07-01T23:40:21+00:00
2026-07-01T23:53:53+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিতের একযুগেও বহাল তবিয়তে যাদুঘর-আদালত
মোফাজ্জেল হোসাইন, বরিশাল
প্রকাশ: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪০ পিএম  আপডেট: ০১.০৭.২০২৬ ১১:৫৩ পিএম
বরিশালে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ দুই'শ বছরের পুরনো ভবনে চলছে যাদুঘর। ছবি : সময়ের আলো
বরিশালে ৩৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন গত এক যুগেও অপসারণ করা যায়নি। ২০১৪ সালে এসব ভবনকে ব্যবহারের অনুপযোগী এবং পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তারও আগের মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ একটি দুইশ বছরের পুরনো ভবনে চলছে যাদুঘর এবং অপর একটি দেড়শ বছরের পুরনো ভবনে চলছে আদালতের কার্যক্রম। প্রতিটি এলাকারই জীবন যাত্রা এখন হুমকির মুখে। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন থেকে একশ হাত দূরত্বের ভবনটি হলো বরিশাল বিভাগীয় যাদুঘর। ২০৭ বছর আগে নির্মাণ করা এই ভবনটির একপাশ থেকে চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সম্প্রতি ভবনটির পশ্চিম পাশের অংশটি দেবে গেছে, নানা স্থানে ধরেছে ফাটল। জরাজীর্ণ ও ফাটলে বিপর্যস্ত পুরো ভবনটি ধসে পড়তে পারে যেকোনো সময়। এখানে কর্মকর্তা কর্মচারীসহ প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের যাতায়াত রয়েছে, সবাই আছে ঝুঁকির মধ্যে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি আজও। 

বরিশাল বিভাগীয় যাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান মো. আরিফুর রহমান জানান, বরিশাল যাদুঘরের এই ভবনটি ১৯৭৯ সালে পরিত্যক্ত ও ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালে আবার এই ভবনকেই সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে কিছু সংস্কার কাজ করা হয়। বর্তমানে ভবনটির পশ্চিমাংশ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এই পাশটাতে দর্শনার্থীদের চলাচল ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিদর্শনটি ভবনটি পরিদর্শন করে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। পরবর্তী করনীয় সম্পর্কে আমরা কিছুই জানিনা। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ইতোমধ্যে ভবনটিতে ফাটল ধরেছে। এই ভবনের পশ্চিমাংশ দেবে গেছে, লোহার ভীমগুলো ছাদ থেকে সরে গেছে, দেয়ালে নোনা ধরেছে।


একই অবস্থা বরিশাল আদালতপাড়া সিভিল কোর্ট ভবনের। ১৩০ বছর আগে নির্মিত এই ভবনে চলে ২০ হাজার মামলার কাজ। প্রতিদিন কয়েক হাজার বাদি ও আসামি এই ভবনকে ঘিরে ওঠা নামা করে। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এই ভবনটি নিয়ে আদালত পাড়ায় সবার মধ্যে রয়েছে দুশ্চিন্তা। এই ভবনে বর্তমানে সিএমএম আদালতের ৮টি এজলাসের কার্যক্রম চলছে। কখনো পলেস্তারা খসে পড়ছে তো কখনো কেঁপে উঠছে ভবনটি। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি। 

এ বিষয়ে আদালতের নাজির কামরুল হাসান জানান, এই ভবনে ৮টি এজলাস রয়েছে। তিন জন জেলা জজ মর্যাদার বিচারক এখানে বসেন। নিয়মিত এখানে ২ হাজারের বেশি লোক যাতায়াত করেন। ঝুঁকিপূর্ণ এই ভবনে বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অতিসম্প্রতিও এখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিচার প্রার্থীরা এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ন্যায় বিচারের জন্য আসেন। 

অপর এক নাজির সৈয়দ মাঈনুল হাসান জানান, গণপূর্ত বিভাগ ইতোমধ্যে এই ভবনটি পরিদর্শন করে গেছে। আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও বিষয়টি অবহিত করেছি। এজলাস সংকটের কারণে এই ভবনে মামলার কার্যক্রম চলমান রাখা হয়েছে। এই ভবন বিষয়ে অতিদ্রুত একটা সমাধান দরকার।

সিটি কর্পোরেশন বলছে, ২০১৪ সালে ৩৫টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পর থেকেই ভবন মালিকদের তাগাদা দেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। ইতোমধ্যে ৭টি ভবন ভেঙে ফেলা হলেও বাকি ২৮টি পরিত্যক্ত ভবন বহাল অবস্থায় আছে। এ বিষয়ে কেউ কারো কথা শুনছেন না। 

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের স্টেট অফিসার মো. শাকিল আহমেদ বলেন, রানা প্লাজার ট্রাজেডির পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করি। ভবন মালিকদের নিয়ে আমরা একাধিকবার বৈঠক করেছি। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কেউ কোনো উত্তর দেয়নি।


৫৮ বর্গ কিলোমিটার বরিশাল মহানগরীতে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে সাধারণত ব্যবস্থা নিয়ে থাকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এবং গণপূর্ত বিভাগ। বিসিসির ৩৫টি এবং গণপূর্তের ৭টি এই ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে গত একযুগে ব্যক্তিমালিকানাধীন ৭টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করা হয়েছে। সরকারি ভবনগুলো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এর অপসারণের হিসেব একেবারেই ছোট। গণপূর্ত থেকে বলা হয়েছে, মূলত সিস্টেম ফলো করতে গিয়ে এই বিলম্ব হচ্ছে। 

জানতে চাইলে বরিশালের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম জানান, আসলে যেকোনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করতে গেলে আমাদের একটা কমিটি আছে। এই কমিটির মাধ্যমে পরিদর্শন পূর্বক সর্বসম্মতি ক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে এটা ভেঙে ফেলতে হবে। কনডেমড ঘোষণা করা পর ওই ভবনে একটা সার্ভে রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়। বিভিন্ন টায়ারের মাধ্যমে এই সার্ভে রিপোর্ট অনুমোদন করাতে হয়। কখনো মন্ত্রণালয় আবার কখনো প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া লাগে। এই সার্ভে রিপোর্ট অনুমোদন পাওয়ার পর আমরা নিলাম আহ্বান করি এবং সর্বোচ্চ দরপত্রদাতাকে অপসারণ প্রক্রিয়া কার্যকর করা হয়। এই প্রসেসগুলো না মেনে কোনো ভবন অপসারণ করা বা ভেঙে ফেলা যায় না। কনডেম ঘোষণার পরই আমরা ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করি। তারপরও যদি কেউ ব্যবহার করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে সেই দায় আমাদের না।

বিষয়টি দুশ্চিন্তার হলেও আশার বাণী শোনাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছে, ভবন ধসের মতো বিপর্যয় ঠেকাতে তাদের সরঞ্জাম ও জনবল দুটোই যথেষ্ট আছে। উপরন্তু প্রস্তুত থাকে আরও একটি স্পেশাল টিম। 

বরিশাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ পরিচালক মো. মানিকুজ্জামান জানান, আমাদের দৃষ্টিতে বরিশালে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আরো বেশি। যেকোনো উচ্চ ভবনের সেফটি আমরা দেখে থাকি। আইন মেনে ভবন করা হয়েছে কিনা আমরা তা দেখি। আমাদের সক্ষমতার কথা বলতে গেলে বলতে হয় ইতোমধ্যে আমরা বরিশালে এখন ১৬ তলা ভবন পর্যন্ত ফায়ার ফাইটিং করতে পারি। ভূমিকম্পের জন্য আমাদের ছোট ছোট সরঞ্জাম পর্যাপ্ত রয়েছে। এছাড়া ২০ সদস্যের একটা বিশেষায়িত টিম গঠন করে তাদেরকে বরিশাল সদরে এনে রাখা হয়েছে। এদেরকে প্রতিদিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বরিশালে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের ক্ষেত্রে আইনের বাধা একটি বড় বাধা হিসেবে সামনে আসে। অনেক অর্পিত সম্পত্তি ভাঙতে গেলে দেখা যায় আইন বলছে এর রূপ পরিবর্তন করা যাবে না। বিসিসি বলছে, অতিদ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   ঝুঁকিপূর্ণ  চিহ্নিত  যাদুঘর  আদালত  বরিশাল 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: