ময়মনসিংহের সাবেক যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং বর্তমানে ভোলা জেলায় কর্মরত মো. রোকন উদ্দিন ভূঁঞার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
এ খবরে অভিযোগটি ধামাচাপা দিতে লবিং তদবিরে কলকাঠি নাড়ছেন দু’টি বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা। এনিয়ে তার বর্তমান ও সাবেক কর্মস্থলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারী মিজানুর রহমান এসব তথ্য নিশ্চিত করে ঘটনার তদন্তপূর্বক বিচার দাবি করেন।
এর আগে গত ২২ এপ্রিল সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার, ভূতুড়ে প্রশিক্ষণ দেখিয়ে ভাতা উত্তোলন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকারও অধিক সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ এনে দুদকে এই অভিযোগটি দায়ের করা হয়।
এতে বলা হয়- রোকন উদ্দিন ভূঁঞা ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ এবং শেরপুরের দায়িত্ব পালনকালে ডরমেটরি ব্যবহার করেও ভাড়া-বিল পরিশোধ না করা, জ্বালানি ও যানবাহন খাতে কাগজে ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, প্রশিক্ষণ খাতে অনিয়ম এবং বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে সরকারি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দু’টি বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন।
সূত্র জানায়, রোকন উদ্দিন ভূঁঞা ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলায় কর্মরত থাকাবস্থায় অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দু’টি বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে একটি মামলায় অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে তৎকালীন সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী ও উপসচিব মুহাম্মদ রায়হানুল হারুন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে তাকে নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিত করা হয়।
অপর মামলায় ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সচিব মোঃ মাহবুব উল আলমের স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপনে তার আত্মসাৎকৃত অর্থের একটি অংশ বেতন থেকে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা কেটে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি আত্মসাৎকৃত অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত আনুতোষিক থেকে কর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
তবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য খাতে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এখনো অমীমাংসিত থাকায় দুদকে অভিযোগের মাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে নজরে আনা হয়, দাবি অভিযোগকারী সূত্রের।
অভিযোগে আরো জানা যায়, রোকন উদ্দিন ভূঁঞা ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ জেলায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকারি ডরমেটরির দুটি ইউনিট পরিবারসহ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলেও কোনো ভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল পরিশোধ করেননি। এতে প্রায় ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে সহকারী পরিচালক ফকর উদ্দিনের কাছ থেকে জোরপূর্বক জমি নিজের নামে লিখে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া সরকারি ড্রাইভার না থাকা সত্ত্বেও গাড়ির জ্বালানি বাবদ প্রায় ১২ লাখ টাকা এবং গাড়ি ব্যবহার না করেও মেরামত ও যন্ত্রাংশ খাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। একই সঙ্গে পোশাক তৈরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যবহারিক কাজের জন্য কাপড় ক্রয় বাবদ ছয় বছরে ৫ লক্ষাধিক টাকা উত্তোলন করা হলেও ওই অর্থ দিয়ে তৈরি পোশাক বিক্রির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পোশাক তৈরির উপকরণ, সেলাই মেশিন, কম্পিউটার ও আসবাবপত্র ক্রয়ের নামে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কোনো সামগ্রী ক্রয় করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একই সময়ে কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে ট্রেড প্রশিক্ষণ উপকরণ ও প্রশিক্ষণ ভাতা বাবদ প্রায় ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং ক্লাস পরিচালনা না করেও সম্মানী ভাতা বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি ১৩টি উপজেলায় অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের নামে ক্লাসে উপস্থিত না হয়েও প্রতি উপজেলা থেকে নিয়মিত অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে ৬ বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন রোকন উদ্দিন ভূঁঞা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী মুজিবুল হক চুন্নু এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া সচিব নূর মোহাম্মদের প্রভাব খাটিয়ে রোকন উদ্দিন নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিজ জেলায় দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ক্ষমতা দাপটে সহকর্মীদের হয়রানি করা ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। এসব কারণে ২০২৩ সালের ২৫ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনে তাকে ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর জেলায় বদলি করা হয়।
এতে অসন্তুষ্ট এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা সরকারী বদলীর আদেশ অমান্য করে জামালপুরে যোগদান না করে তৎকালীন সচিবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আরেকটি প্রজ্ঞাপনে তাকে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ভোলা জেলায় বদলি করা হয়। এছাড়াও শেরপুর জেলায় দায়িত্ব পালনকালে হল ভাড়া ও আবাসন সংক্রান্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করার পাশাপাশি সরকারি বাসভবনে বিনামূল্যে অবস্থান করে ভাড়া আত্মসাতের বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এতে আরো বলা হয়, বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও রোকন উদ্দিন ভূঁঞা বেতন ও ভাতা উত্তোলন করেছেন। বিশেষ করে বর্তমানে ভোলা জেলায় কর্মরত থাকলেও অধিকাংশ সময় তিনি ময়মনসিংহে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, রোকন উদ্দিন ভূঁঞা ময়মনসিংহে থাকাকালীন সময়ে ইমপ্যাক্ট (ফেজ-৩) প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত সাড়ে ৮৮ হাজার টাকা উত্তোলন করে ব্যয় না করেই আত্মসাৎ করেছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. রোকন উদ্দিন ভূঁঞা বলেন, অভিযোগ যদি সত্য হয় তাহলে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে, বলেই তিনি মুঠোফোনের কল কেটে দেন।
সময়ের আলো/আতা