প্রায় চার শতাব্দী আগে ইউরোপের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুই পরাশক্তি স্পেন ও অস্ট্রিয়া। একই হাবসবার্গ রাজবংশের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের সম্পর্ক ছিল দ্বন্দ্ব, আধিপত্যের লড়াই ও রাজনৈতিক সংঘাতের। ১৬ ও ১৭ শতকে সাম্রাজ্য বিস্তার, ধর্মীয় প্রভাব এবং স্প্যানিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘটিত ‘ত্রিশ বছরের যুদ্ধ’ ও ‘স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধ’ ইউরোপের ইতিহাসে রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে আছে। সেই ইতিহাস আজ আর যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, ফুটবল মাঠে ফিরে আসছে নতুন রূপে। বৃহস্পতিবার রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সোফাই স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের শেষ-৩২ পর্বে মুখোমুখি হবে স্পেন ও অস্ট্রিয়া।
বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন গ্রুপ ‘এইচ’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে উঠেছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও এরপর সৌদি আরব ও উরুগুয়েকে হারিয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। শেষ ম্যাচে উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারানোর একমাত্র গোলটি করেন আলেক্স বায়েনা। তবে এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাদের রক্ষণভাগ। তিন ম্যাচেই ক্লিন শিট রেখেছে লা রোজারা। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রতিপক্ষ কোনো দলই প্রথমার্ধে স্পেনের গোলমুখে লক্ষ্যভেদী শট নিতে পারেনি। শেষ পাঁচ বিশ্বকাপ ম্যাচে তারা কোনো প্রতিপক্ষকে ছয়টির বেশি শট নেওয়ার সুযোগও দেয়নি। ১৯৬৬ সালের পর এই কীর্তি গড়তে পেরেছে কেবল ২০২২ সালের আর্জেন্টিনা ও বর্তমান স্পেন।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে (টাইব্রেকারে হার বাদে) স্পেন এখন টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত। জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড থেকে তারা মাত্র এক ম্যাচ দূরে। ফলে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয় মানে শুধু শেষ ষোলো নিশ্চিত করা নয়, ইতিহাসও ছোঁয়া। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার নকআউটে ওঠার গল্পটি নাটকীয়তায় ভরা। গ্রুপ ‘জে’-তে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার পেছনে দ্বিতীয় হয়ে শেষ-৩২ নিশ্চিত করেছে রালফ রাংনিকের দল। শেষ ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-৩ গোলে ড্র করে গোল ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখে তারা। ম্যাচের ৯৬তম মিনিটে সাসা কালাইজিচের হেডে করা সমতাসূচক গোলই অস্ট্রিয়াকে নকআউটে তুলে দেয়। বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে পিছিয়ে পড়েও অপরাজিত থাকার প্রথম দল হিসেবে অনন্য রেকর্ড গড়েছে তারা। ১৯৫৪ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলছে অস্ট্রিয়া।
বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে স্পেন এগিয়ে। তাদের অবস্থান ২ নাম্বারে, যেখানে অস্ট্রিয়ার অবস্থান ২৪তম। তবে বিশ্বকাপে র্যাঙ্কিংয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মুহূর্ত, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা। যার প্রমাণ ইতিমধ্যেই দিয়েছে অস্ট্রিয়া। ম্যাচের আগে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেছেন, ‘নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচ সহজ নয়। অস্ট্রিয়া অত্যন্ত সংগঠিত এবং শারীরিকভাবে শক্তিশালী দল। আমাদের নিজেদের ছন্দে খেলতে হবে এবং পুরো ম্যাচজুড়ে মনোযোগ ধরে রাখতে হবে।’ অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিকও আত্মবিশ্বাসী। তার ভাষায়, ‘স্পেন বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। কিন্তু আমরা এখানে শুধু অংশ নিতে আসিনি। নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারলে যেকোনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব।’
স্পেনের শক্তির মূল ভিত্তি তাদের বল দখলে রেখে খেলার দক্ষতা, সৃজনশীল মাঝমাঠ এবং দুর্ভেদ্য রক্ষণ। রদ্রি, পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইস, গাভি ও দানি ওলমো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী। রক্ষণে আয়মেরিক লাপোর্তে ও রবিন লে নরমঁর জুটি এখন পর্যন্ত অনবদ্য। তবে আক্রমণভাগে কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। ইয়েরেমি পিনো, নিকো উইলিয়ামস ও ভিক্টর মুনিওস চোটের কারণে অনিশ্চিত। উরুগুয়ের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা আলেক্স বায়েনা ও লামিনে ইয়ামালের ওপর আবারও আস্থা রাখবেন দে লা ফুয়েন্তে।
সময়ের আলো/আআ