খামেনির দাফন ঘিরে শোকের সমুদ্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় দাফন কার্যক্রম শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড

2026-07-05T00:49:18+00:00
2026-07-05T00:50:01+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
খামেনির দাফন ঘিরে শোকের সমুদ্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৯ এএম  আপডেট: ০৫.০৭.২০২৬ ১২:৫০ এএম
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সকে লাখ-লাখ মানুষের সমাগম। ছবি : সংগৃহীত
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় দাফন কার্যক্রম শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সকে ঘিরে লাখ-লাখ মানুষের সমাগম ঘটেছে। ছয় দিনব্যাপী এ শোকানুষ্ঠান ইরানের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি ইরাকেও অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাকে চূড়ান্তভাবে দাফন করা হবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে রাজধানীতে। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং বহু এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা জানান, বিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সের প্রধান চত্বর অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগেই পূর্ণ হয়ে যায়। বহু মানুষ কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে সেখানে পৌঁছান। তেহরানের বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনেও সকাল থেকে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কালো পোশাক পরিহিত শোকাহত মানুষের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা ও লাল ব্যানার।  

ইরানি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে লাল পতাকা প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সমবেত জনতা ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দিতে থাকে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, কাচঘেরা একটি বিশেষ স্থাপনায় খামেনির কফিন রাখা হয়েছে। একই স্থানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের কফিনও রাখা হয়। হাজারো মানুষ সেখানে অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

পরিবারের সদস্যদেরও স্মরণ : এই দাফন কার্যক্রমে শুধু আলি খামেনিকেই নয়, তার পরিবারের নিহত সদস্যকেও স্মরণ করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন তার এক জামাতা, জ্যেষ্ঠ কন্যা, ১৪ মাস বয়সি নাতনি এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির স্ত্রী। তবে মোজতবা খামেনি নিজে জনসমক্ষে দাফন কার্যক্রমে উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পর ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ‘যেকোনো ভুল পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের ব্যাপক উপস্থিতি : খামেনির দাফনকে ঘিরে তেহরানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ ও প্রতিনিধিদের সমাগম ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বহু দেশ আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ইরাকের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের স্পিকার, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, সিনেট চেয়ারম্যান এবং সেনাপ্রধান, আফগানিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট উপস্থিত হয়েছেন।


উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কাতারের শূরা কাউন্সিলের স্পিকার, ওমানের স্টেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মিসরের সিনেট স্পিকার অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। রাশিয়ার বিশেষ দূত হিসেবে দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান তেহরানে গেছেন। চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির উপসভাপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশ নিচ্ছে।

এ ছাড়া বেলারুশ, জর্জিয়া, সার্বিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, বুরকিনা ফাসো, নামিবিয়া, নিকারাগুয়া এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকেও প্রতিনিধি দল এসেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার শোকানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন এবং ডেভেলপিং-৮ (সংক্ষেপে ডি-৮)-এর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত রয়েছেন। এ ছাড়া হিজবুল্লাহ, প্যালেস্টিনিয়ান ইসলামিক জিহাদ এবং ইয়েমেন ও লেবাননের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতারাও অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।

প্রতিশোধের আহ্বান ও যুদ্ধের আবহ : আলজাজিরা জানিয়েছে, দাফনের পুরো আয়োজনজুড়েই প্রতিশোধের আহ্বান স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সমবেত মানুষের হাতে থাকা লাল পতাকা ও সেøাগানগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেকের হাতে শহিদদের ছবি ও যুদ্ধকালীন পোস্টারও দেখা গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানগুলোর একটি।

ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক : এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির দাফন ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে মাউন্ট রাশমোরে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। 

তিনি বলেন, ‘আমরা ভেনেজুয়েলাকে এক দিনেই পরাজিত করেছি এবং ইরানকেও কঠোরভাবে আঘাত করেছি। তারা সমঝোতা করতে মরিয়া। আমরা ভালো মানুষ বলেই তাদেরকে খামেনির দাফনের জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি।’ ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ভবিষ্যতে কোনো শান্তি চুক্তি হলে ইরান যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, ভুট্টা ও সয়াবিন আমদানি করবে এবং মার্কিন কৃষকরাই সেই চাহিদা পূরণ করবেন।

তেহরানের পাল্টা জবাব : ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘যে দেশের চার কোটিরও বেশি মানুষ খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল, সেই দেশের নেতার অন্য একটি জাতিকে ক্ষুধার্ত বলা আসলে নিজের সমস্যারই প্রতিফলন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সম্পদ আমাদেরই, আমাদের সিদ্ধান্তও আমাদেরই। নিজেদের অপুষ্টির হার নিয়েই আপনাদের চিন্তা করা উচিত।’ মার্কিন কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৪ কোটির বেশি মানুষ ‘সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম’ (স্ন্যাপ)-এর আওতায় খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন।


নতুন যুগের সূচনার প্রতীক : আলজাজিরা বলছে, আলি খামেনির মৃত্যু শুধু একজন দীর্ঘমেয়াদি নেতার অবসান নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনাও বটে। তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন হিসেবে এই দাফন কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে গভীর নজর কাড়ছে। আগামী কয়েক দিনে ইরান ও ইরাকজুড়ে চলমান শোকানুষ্ঠান দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করবে বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   খামেনি  দাফন  শোক  সমুদ্র  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: