গাইবান্ধায় নদীভাঙনে নিঃস্ব সহস্রাধিক পরিবার, বিলীন স্কুল-মাদরাসা-ফসলি জমি

কায়সার রহমান রোমেল

সারাদেশ

গাইবান্ধার বুক চিরে বয়ে চলা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও করতোয়া- এই ৫ নদ-নদীর পানি এখনও বিপদসীমা স্পর্শ করেনি, কিন্তু

2026-07-05T14:28:35+00:00
2026-07-05T14:35:07+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
স্বপ্ন ভাসিয়ে নেয় নদী
গাইবান্ধায় নদীভাঙনে নিঃস্ব সহস্রাধিক পরিবার, বিলীন স্কুল-মাদরাসা-ফসলি জমি
কায়সার রহমান রোমেল
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ২:২৮ পিএম  আপডেট: ০৫.০৭.২০২৬ ২:৩৫ পিএম
গাইবান্ধায় নদীভাঙন। ছবি : সময়ের আলো
গাইবান্ধার বুক চিরে বয়ে চলা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও করতোয়া- এই ৫ নদ-নদীর পানি এখনও বিপদসীমা স্পর্শ করেনি, কিন্তু গত কয়েক দিনে পানি বাড়া-কমার ওঠানামার মধ্যেই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে নদীভাঙন। জেলার চার উপজেলা- সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটায় অন্তত ২৫টি পয়েন্টে চলছে এই ভাঙন, যাতে গত এক সপ্তাহে গৃহহীন হয়েছে আট শতাধিক পরিবার। শুধু সুন্দরগঞ্জেই তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়েছে ৫ শতাধিক বসতভিটা। নদীর নির্মম থাবায় হারিয়ে গেছে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাদরাসা, কয়েকশ বিঘা আবাদি জমি আর অসংখ্য গাছপালা।

চোখের পলকে শেষ হয়ে যাচ্ছে জীবনের সঞ্চয়
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট সংলগ্ন কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ রসুলপুরে ভাঙনের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র কিংবা গবাদিপশু সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পাচ্ছেন না। মুহূর্তের মধ্যে বসতভিটা, আবাদি জমি, গাছগাছালি ও বাঁশঝাড় তলিয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। সর্বস্ব হারানো এসব মানুষ এখন আশ্রয় নিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে, রাস্তার ধারে কিংবা অন্যের জমিতে।

দক্ষিণ রসুলপুর গ্রামের আফরুজা বেগম (৫২) কষ্টে জমানো টাকায় কেনা তার ১০ শতক জায়গা হারানোর কথা জানিয়ে বলেন, ‘শেষ সম্বলটুকুও এখন নদীর মধ্যে চলে গেছে।’

একই গ্রামের আসমানী বেগমের কণ্ঠেও একই হতাশা- ভাঙন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গাছপালা কাটার বা বাড়ি সরানোর মতো সময়ও মিলছে না। দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে রক্ষার আকুতি জানান তিনি।


ফুলছড়ি উপজেলার চৌমোহন চরে গত এক সপ্তাহেই সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়েছে ২ শতাধিক পরিবার। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে চৌমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েক শ একর আবাদি জমি ও অসংখ্য গাছপালা। কিছুদিন আগের কালবৈশাখি ঝড়ের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই এই নতুন বিপর্যয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন চরবাসী। তারা দ্রুত ঘরবাড়ি-আসবাব সরিয়ে নৌকায় নদী পার হয়ে অন্য চরে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছেন। বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে ও নিচু চরে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো খাদ্য, বাসস্থান ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে ভুগছে।

চরের প্রবীণ বাসিন্দা রোস্তম আলী আক্ষেপ করে জানান, এমন ভয়াবহ ভাঙন তিনি আগে দেখেননি। আগে ভাঙনের আগাম আভাস পাওয়া যেত, এবার নদী সে সুযোগও দেয়নি। আরও দু-তিন বছর থাকার আশা করলেও সব হারিয়ে এখন নিচু জায়গায় নতুন ঘর তুলছেন, বর্ষায় পানি বাড়লে সেটিও ডুববে বলে আশঙ্কা তার।

স্কুল হারানোয় বিপাকে পড়েছে শিশুরাও। অভিভাবক মর্জিনা বেগম জানান, স্কুলটি অন্য চরে সরিয়ে নেওয়া হলেও সেখানে তাদের থাকার জায়গা নেই বলে পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়ের লেখাপড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান ও চর গবেষক এম. আবদুস সালাম বলেন, ‘নদীভাঙন শুধু সম্পদ কেড়ে নেয় না, মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাও ভেঙে দেয়। তাই ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোরও দ্রুত এগিয়ে আসা জরুরি।’ 


সুন্দরগঞ্জে তিস্তার গ্রাসে ৫ শতাধিক ভিটা
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়। গত এক সপ্তাহে তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে সেখানে বিলীন হয়ে গেছে পাঁচ শতাধিক বসতভিটা, আবাদি জমি ও রাস্তাঘাট। উপজেলার বেলকা, হরিপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়ন সম্পূর্ণরূপে এবং তারাপুর, দহবন্দ, শান্তিরাম, কঞ্চিবাড়ি, শ্রীপুর, চণ্ডিপুর ইউনিয়ন ও পৌরসভার আংশিক এলাকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তিস্তা। কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটিতে তিস্তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ, যার ফলে দুই নদীর মিলনস্থলেও ভাঙন প্রকট আকার নিয়েছে। বর্তমানে হুমকিতে রয়েছে আরও শত শত পরিবারের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ডান তীরের পুরাতন বেড়িবাঁধ।

কাপাসিয়া ইউনিয়নের উত্তর লালচামার, ভোরের পাখি, উজান বুড়াইল, কেরানীরচর ও ভাটি বুড়াইল এলাকার বাসিন্দারা- আবুল হোসেন, রবিউল ইসলাম, শাহ্ কামাল, জাহাঙ্গীর, জাফর আলী, জয়নাল আবেদীন, মমিনুল ইসলামসহ অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দিন-রাত অবিরাম ভাঙনে তাদের শেষ সম্বলটুকু নদী কেড়ে নিয়েছে। পরিবার নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন বা কী খাবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই তাদের কাছে। প্রতিবছর সর্বস্বান্ত হলেও ভাঙন ঠেকাতে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ তাদের।

কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজু মিয়া জানান, তার ইউনিয়নের ৩, ৪ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে। প্রায় একশ বিঘা আবাদি জমি ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে, একটি মাদরাসা নদীতে চলে গেছে এবং প্রায় ৭০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে দাবি স্থানীয়দের।

কাপাসিয়া ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম ও হাবিজার রহমান জানান, জরুরি ভিত্তিতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে।


সদর উপজেলায়ও ভাঙনের কবলে মাদরাসা, বিলীন বহু ভিটা
গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের সিধাইল এলাকায় নদীভাঙনে ইতোমধ্যে ৩০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে, আর হুমকির মুখে রয়েছে আরও অনেক পরিবার। এলাকার একমাত্র সিধাইল কওমি মাদরাসাটিও এখন ভাঙনের মুখে।

সিধাইল গ্রামের আব্বাস মিয়া জানান, তার নিজের জীবদ্দশাতেই ৯ বার বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে, আর তার বাবার আমলে হয়েছিল আরও বহুবার। এ বছরও ভাঙন অব্যাহত থাকায় ২০টির বেশি পরিবার ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে সরে গেছে।

সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের চর কুন্দেরপাড়া এবং মোল্লাচর ইউনিয়নের চিথলিয়া দিগর গ্রামেও ভাঙন ও জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে। চিথলিয়া দিগর গ্রামের কৃষক মোতালেব জানান, বন্যার পানিতে তার ৩ বিঘা জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে।

নষ্ট হয়েছে ১১৮ হেক্টর জমির ফসল
শুধু ভিটেমাটি নয়, পানি ওঠানামার প্রভাবে ফসলের মাঠেও নেমে এসেছে বিপর্যয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলার সাত উপজেলায় বন্যায় প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে আউশ ধান ৪৫ হেক্টর, পাট ৩০ হেক্টর, তিল ২৫ হেক্টর, আমন বীজতলা ৮ হেক্টর ও শাকসবজি ১০ হেক্টর।

সুন্দরগঞ্জের কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালিরখামার গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলামের ২ বিঘা জমির পাটক্ষেত এখন গলাসমান পানির নিচে। একই এলাকার আরেক কৃষক রানু মিয়ার এক বিঘা জমির তিলক্ষেত তলিয়ে গেছে হঠাৎ উজান থেকে পানি ছাড়ার কারণে।

ফুলছড়ির রসুলপুর গ্রামের রবিউল মিয়া জানান, পানি বাড়ায় সবজির জমি একে একে নদীতে বিলীন হচ্ছে, আর ভাঙন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে বসতবাড়ির দিকে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের হিসাব অনুযায়ী জেলায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল ইতোমধ্যে নষ্ট হয়েছে।’

বন্যার পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে ক্ষতির এই তালিকা আরও দীর্ঘ হবে বলে আশঙ্কা তার।


বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ, নেই স্থায়ী সমাধান
গাইবান্ধার নদ-নদীপাড়ের বাসিন্দাদের জন্য এই দুর্যোগ নতুন কিছু নয়। অনেকে জীবদ্দশায় তিন-চারবার, এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে তারও বেশি বার হারিয়েছেন নিজের বসতভিটা। বছরের পর বছর নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা এসব মানুষের চোখেমুখে এখন শুধু অনিশ্চয়তা আর হতাশার ছাপ। ভাঙনরোধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা প্রতি বছরই একই প্রশ্ন তোলেন- কবে মিলবে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি?

জিও ব্যাগে সাময়িক প্রতিরোধ, স্থায়ী কাজের অপেক্ষা
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, পানি বাড়ার প্রভাবে জেলার নদ-নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের অন্তত ২০ থেকে ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হয়েছে। প্রতিটি ভাঙনকবলিত এলাকার প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে এবং সব পয়েন্টেই কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভাঙনকবলিত অন্যান্য স্থানে স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন পাঠানো হয়েছে, অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফ্ফাত জাহান তুলি জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন করে দ্রুত উপজেলা প্রশাসনে জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙনরোধে জরুরি ব্যবস্থা নিতে বলার পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ামাত্র ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সহায়তা বিতরণ করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসের মধ্যেই কেটে যাচ্ছে দিনের পর দিন, আর নদী প্রতিদিনই গ্রাস করে চলেছে নতুন নতুন এলাকা। গাইবান্ধার চার উপজেলার প্রায় ২৫টি পয়েন্টে চলমান এই ভাঙনে ইতোমধ্যে সহস্রাধিক পরিবার হারিয়েছে তাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠিকানাটুকু। জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে ঠিকই, কিন্তু স্থায়ী বাঁধ বা টেকসই নদীশাসন প্রকল্প ছাড়া এই দুর্ভোগ থেকে গাইবান্ধাবাসীর মুক্তি মিলবে না বলেই মনে করছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   গাইবান্ধা  নদীভাঙন  বিলীন  কুড়িগ্রাম  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: