বাগেরহাটে টানা তিন দিনের অবিরাম ও থেমে থেমে চলা মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে উপকূলীয় এ জেলার জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পাশাপাশি জোয়ারের পানির চাপে জেলা পৌর শহরসহ মোরেলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বাগেরহাট পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকা এখন পানির নিচে। বারইখালী এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান নান্নু জানান, রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর হাঁটু পানির নিচে তলিয়ে গেছে। রান্নাঘরে পানি ওঠায় গত তিন দিন ধরে বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়ি থেকে রান্না করে এনে খেতে হচ্ছে।
একই এলাকার মোর্শেদা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় এখন জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে রান্না করতে হয়। জোয়ারের পানি নামলে তবেই চুলা জ্বলে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘরে টিকে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো শহর তলিয়ে যায়। বর্তমানে জেলার প্রায় ৩০টি গ্রাম জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
জলাবদ্ধতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার অর্থনীতি। পৌর শহরের কাপুড়িয়া পট্টি, কাঁচাবাজার, কলেজ রোড, কেজি স্কুল সড়ক এবং উপজেলা প্রশাসনিক চত্বর পানিতে তলিয়ে গেছে।
মোরেলগঞ্জ শহরের ফল ব্যবসায়ী মিজান শেখ, কসমেটিকস ব্যবসায়ী হারুন মোল্লা ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী পলাশ শিকদার জানান, দুপুর ১২টা বাজতেই বাজারের রাস্তায় পানির চাপ বেড়ে দোকানে পানি ঢুকে যায়। দিনে ও রাতে অন্তত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা দোকানপাট বন্ধ রাখতে হয়। ফলে গ্রাম থেকে আসা ক্রেতারা তাড়াহুড়ো করে চলে যায়।
শহরের ফল ব্যবসায়ী লাল মিয়া বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য একপ্রকার বন্ধ। মহাজনদের টাকা কীভাবে দেবো তা নিয়ে চিন্তায় আছি। একটি টেকসই বেড়িবাঁধ না হলে এই দুর্ভোগ থেকে আমাদের মুক্তি নেই। অন্যদিকে, কাজ না পেয়ে অলস ও অনাহারে দিন কাটছে ভ্যানচালক জব্বার হাওলাদারের মতো শত শত দিনমজুরের।
এদিকে জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার পানগুছি নদীর অব্যাহত ভাঙনে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিলীন হয়ে নিঃস্ব হয়েছে শত শত পরিবার। নতুন করে জলাবদ্ধতার কারণে উপজেলার বদনীভাঙ্গা, সানকিভাঙ্গা, পাঠামারা ও খাউলিয়া বাজার সংলগ্ন ব্রিজ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া এসিলাহা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, বদনীভাঙ্গা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৮০ নং বি পাঠামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বহরবুনিয়ার এসবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ নদীর তীরবর্তী বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রাম প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাগেরহাট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল জানান, মোরেলগঞ্জ শহর সংলগ্ন রামপাল-মোংলা হয়ে ঘষিয়াখালী পর্যন্ত ৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে পানগুছি নদীর ভাঙন থেকে বাগেরহাট জেলা সদর সংলগ্ন এলাকা সংরক্ষণ এবং বিষখালী নদী পুনঃখনন শীর্ষক মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে ওই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা ও নদী ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সময়ের আলো/জোই