একসময় যেখানে কৃষকের স্বপ্ন সীমাবদ্ধ ছিল মৌসুমি ফসলের আয়-ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে, সেখানে আজ পানের বরজ এনে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। জালম, মাগুড়া ও জাগেশ্বর এখন শুধু তিনটি গ্রামের নাম নয়। এগুলো গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তন, কৃষকের আত্মবিশ্বাস এবং স্বাবলম্বিতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়েছে।
উত্তরের জেলা নওগাঁ সদর উপজেলা থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে কির্ত্তিপুর ইউনিয়নের তিনটি গ্রাম জালম, মাগুড়া ও জাগেশ্বর। গ্রামগুলোতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সবুজের এক অনন্য বিস্তার। চারদিকে সারি সারি পানের বরজ, যেন সবুজের ভেতরে আরেক সবুজের রাজ্য।
স্থানীয়দের কাছে এখন এই জনপদ পরিচিত ‘পানের গ্রাম’ নামে। একসময় ধান চাষনির্ভর এই এলাকার কৃষকরা এখন পানের আবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন নতুন অর্থনীতির ভিত্তি।
প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস এই তিন গ্রামে। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি যেদিকে চোখ যায়, সেখানেই পানের বরজ। প্রতিটি বরজ যেন কৃষকের পরিশ্রম, স্বপ্ন ও সাফল্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে সংগ্রাম থেকে সচ্ছলতায় পৌঁছে যাওয়ার গল্প।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকার উঁচু ও বন্যামুক্ত বেলে-দোআঁশ মাটি এবং অনুকূল আবহাওয়া পানের চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নিয়ন্ত্রিত সেচব্যবস্থা, আগাছামুক্ত জমি, সঠিক পানি নিষ্কাশন ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে কৃষকরা গড়ে তুলেছেন আধুনিক ও কার্যকর চাষাবাদ পদ্ধতি। নিজেদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কৃষি বিভাগের পরামর্শও তাদের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত প্রায় ১৫ বছরে ধীরে ধীরে এই এলাকায় পানের চাষের বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে তিন গ্রামের প্রায় ৩০০ কৃষক ৭০০টিরও বেশি বরজে পান উৎপাদন করছেন। বাংলা, মিঠা, সাচি, কর্পূরী, গ্যাচ, নাতিয়াবাসুত, উজানী ও মাঘিসহ বিভিন্ন জাতের পান এখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে।
মাগুড়া গ্রামের কৃষক অরূপ কুমার মণ্ডল ও বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল জানান, গত কয়েক বছরে পান চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের ভাষায়, ধান চাষের তুলনায় পান চাষে লাভ বেশি এবং সারা বছরই উৎপাদন পাওয়া যায়। ফলে এটি এখন শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং আর্থিক স্বচ্ছলতার অন্যতম ভরসা।
জালম গ্রামের অভিজ্ঞ পানচাষি বিধান চন্দ্র প্রায় ১৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তার পাঁচ বিঘা জমিতে পানের বরজ রয়েছে। তিনি জানান, প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। বাঁশের কাঠামো নির্মাণ, সেচব্যবস্থা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে প্রাথমিক ব্যয় কিছুটা বেশি হলেও নিয়মিত ফলনের কারণে তা দ্রত লাভে পরিণত হয়।
তিনি বলেন, একটি বরজ সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় বছর পর্যন্ত ভালো উৎপাদন দেয়। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার পাতা সংগ্রহ করা যায়। গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই পোয়া বা চার হাজারের বেশি পাতা পাওয়া যায়। বর্তমান বাজারে বড় আকারের পান প্রতি পোয়া সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা, মাঝারি পান দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং ছোট পান ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জাগেশ্বর গ্রামের কৃষক সুনিল চন্দ্র প্রামাণিকের সফলতার গল্পও বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। সাত বিঘা জমিতে তার পানের আবাদ রয়েছে। তিনি জানান, প্রতি বিঘা জমি থেকে মৌসুমে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার পান বিক্রি করা সম্ভব। উৎপাদিত পান জয়পুরহাট, দিনাজপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। অনেক পাইকার সরাসরি গ্রামে এসে কৃষকদের কাছ থেকে পান কিনে নিয়ে যান।
তবে সাফল্যের এই যাত্রাপথ পুরোপুরি বাধাহীন নয়। বর্ষা মৌসুমে ‘দলাপচা’ রোগ পানের বরজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কৃষকরা জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো ওষুধ প্রয়োগ করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
স্থানীয় কির্ত্তিপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, নওগাঁ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে পান চাষ মূলত এই তিন গ্রামেই বেশি বিস্তৃত। এখানকার সাফল্য দেখে আশপাশের এলাকার কৃষকরাও আগ্রহী হচ্ছেন। সারা বছর উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় পান চাষ একটি টেকসই ও লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৩ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের অধিক লাভ নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/জেডি