বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার আহমদাবাদ (বেতাল) হোসাইনিয়া আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. আ. হালিমের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিজ হাতে ঘষামাজা সার্টিফিকেট, আর্থিক অনিয়ম ও দায়িত্ব পালনে গুরুতর অসাদাচারণসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাকে অধ্যক্ষের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে মাদরাসার গভর্নিংবডির সভায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে উপাধ্যক্ষ মো. অলিউল্লাহ্কে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
একই চিঠিতে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহের বিষয়ে তাকে সন্তোষজনক লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায়, তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা তনয় সিংহকে প্রধান করে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তনয় সিংহ জানান, পদের মর্যাদার দিক থেকে মাদরাসার গভর্নিংবডির তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার এখতিয়ার নেই। ইউএনও কিংবা জেলাপ্রশাসক তাকে এ দায়িত্ব দিতে পারেন।
মাদরাসার গর্ভনিংবডির সভাপতি মো. রুহুল আমিন জসিম বলেন, ‘তনয় সিংহকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়, বিষয়টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি। তিনি বৃহস্পতিবার মাদরাসায় এসে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন।’
জানা গেছে, গত ২১ মে গভর্নিংবডির অভিভাবক সদস্য মো. আ. রহিম ফরাজী মাদরাসার সভাপতি বরাবর অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসঙ্গতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
লিখিত অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, অধ্যক্ষ মো. আ. হালিম দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মাদরাসার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। বেসরকারি শিক্ষকদের নৈমিত্তিক ছুটির বিধান উপেক্ষা করে তিনি ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ১৬ দিন ছুটি ভোগ করেছেন। পরবর্তীতে, গভর্নিংবডির সদস্যরা এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাইলে, তিনি বিষয়টিকে নিজের ‘ব্যক্তিগত ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যান।
এছাড়া, অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন মাদরাসায় অনুপস্থিত থাকার পরও, নিয়ম অনুযায়ী মেডিকেল ছুটি গ্রহণ না করে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগপত্রে অধ্যক্ষের শিক্ষাগত সনদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, তার দাখিল, আলিম ও ফাজিল পাসের সনদের একাধিক স্থানে ঘষামাজা ও কাটাকাটির চিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সনদগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে অডিট কমিটির নিরীক্ষায় মাদরাসার অর্থসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। একইসঙ্গে প্রভাব খাটিয়ে এসব অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মাদরাসার এক নিরাপত্তারক্ষীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগসংক্রান্ত ফাইল পার্শ্ববর্তী খালে ফেলে দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পরে পুলিশ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ওই ফাইল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তারক্ষী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়াও, মাদরাসার গাছ ও পুরনো আসবাবপত্র নিয়মবহির্ভূতভাবে বিক্রিসহ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অতীতের আরও কিছু গুরুতর অভিযোগের কথা লিখিত অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে।
রহিম ফরাজী জানান, অধ্যক্ষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও আচরণে স্থানীয় বাসিন্দা এবং অভিভাবকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব মাদরাসায় শিক্ষার্থী ভর্তির ওপরও পড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আ. হালিম জানান, মঙ্গলবার সকালে মাদরাসার গভর্নিংবডির সভায় তাকে মারধর করে চাবি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তাকে অন্যায়ভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি এ ব্যাপারে থানায় সাধারণ ডায়েরি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ করেছেন এবং সাংবাদিক সম্মেলন করবেন বলেও জানান।
তবে, অধ্যক্ষকে মারধরের অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন গভর্নিংবডির সভাপতি রুহুল আমিন।
এদিকে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী মাদরাসার সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিক্ষার মান বজায় রাখতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা উদ্ঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/মহু