বাড়ছে নদীর পানি ভাঙছে পাড়

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

গাইবান্ধার নদ-নদীগুলো আবারও যেন অশনিসংকেত দিচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর মৌসুমি বৃষ্টির প্রভাবে জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা-ব্রহ্মপুত্র,

2026-07-21T05:15:58+00:00
2026-07-21T05:15:58+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বাড়ছে নদীর পানি ভাঙছে পাড়
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ৫:১৫ এএম 
গাইবান্ধার নদ-নদীগুলোর ভাঙছে পাড়। সংগৃহীত ছবি
গাইবান্ধার নদ-নদীগুলো আবারও যেন অশনিসংকেত দিচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর মৌসুমি বৃষ্টির প্রভাবে জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা-ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। একই সময়ে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। প্রায় প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি ও গাছপালা। 

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে এমন শঙ্কা স্থানীয়দের। এদিকে পানি বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার অন্তত ২৫টি এলাকায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর তীরজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা। ইতোমধ্যে দুই শতাধিক বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য থেকে জানা গেছে। ফলে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।

এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, জেলার কোনো নদীর পানি এখনও বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। তাই তাৎক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে উজানে ভারী বৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

সরেজমিন দেখা গেছে, কোথাও বসতঘরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, কোথাও আবার উঠান থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে নদীর গহ্বর। আতঙ্কে অনেকে ঘরের টিন, কাঠ ও আসবাবপত্র খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

সদর উপজেলার এক কৃষক বলেন, আমাদের এলাকার বিঘার পর বিঘা পাটক্ষেত ভেঙে নদীতে চলে গেছে। বছরের সব পরিশ্রম এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে সেই চিন্তায় আছি।

সুন্দরগঞ্জের এক নদীপাড়ের বাসিন্দা বলেন, নদীর ভাঙন দেখে আমরা দিশাহারা। এখন বাড়িঘর সরাব, নাকি সহায়-সম্বল বাঁচাব কিছুই বুঝতে পারছি না। প্রতিদিনই মনে হয় এই বুঝি বাড়িটাও নদীতে চলে গেল।

এদিকে ভাঙন ঠেকাতে জেলার প্রায় ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় জিও ব্যাগের সংখ্যা কম। আবার অনেক জায়গায় কাজ ধীরগতিতে হওয়ায় নদীর তীব্র স্রোতে ফেলা জিও ব্যাগও দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে ভাঙন থামানো যাচ্ছে না। 

বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চলের মানুষ এখন পানির উচ্চতা ও নদীর স্রোত দুটোর দিকেই সতর্ক নজর রাখছেন। কারণ পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতাও বেড়ে যায়। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি 

কৃষিজমি, গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গাইবান্ধা জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ২৪ ঘণ্টায় প্রতিটি পয়েন্টেই তা বেড়েছে। একই সঙ্গে জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর তীরজুড়ে অব্যাহত রয়েছে ভাঙন। পানি বৃদ্ধি ও ভাঙন এই দুই সংকট একসঙ্গে চেপে বসায় জেলার নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। সোমবার বেলা ৩টার হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী এই চিত্র উঠে এসেছে। 

এদিন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের সমতল থেকে পরিমাপকৃত পানির উচ্চতা অনুযায়ী জেলার যমুনা-ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়া ও তিস্তা- চারটি নদ-নদীর পানিই টানা বাড়তির দিকে রয়েছে। জেলার সবচেয়ে বড় নদী যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের ফুলছড়ি পয়েন্টে সোমবার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৮ দশমিক ৭৬ মিটার যেখানে এই পয়েন্টের বিপদসীমা ১৯ দশমিক ৩৫ মিটার। অর্থাৎ পানি বিপদসীমার ৫৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

২৪ ঘণ্টায় এখানে পানি বেড়েছে ৯ সেন্টিমিটার যা পর্যবেক্ষণাধীন পয়েন্টগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির হারগুলোর একটি। শহরের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ঘাঘট নদীর নিউব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা মাপা হয়েছে ২০ দশমিক ২৮ মিটার, বিপদসীমা ২১ দশমিক ২৫ মিটার হওয়ায় পানি বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখানেও এক দিনে পানি বেড়েছে ৯ সেন্টিমিটার। জেলা শহরের অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ঘাঘটের এই বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়তি সতর্কতা লক্ষ করা গেছে।

চার নদীর মধ্যে করতোয়া নদীর চকরহিমাপুর পয়েন্টে বিপদসীমার সঙ্গে পানির ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। বর্তমান পানির উচ্চতা ১৭ দশমিক ৮০ মিটার যেখানে বিপদসীমা ১৯ দশমিক ৭০ মিটার; অর্থাৎ পানি বিপদসীমার প্রায় ২ মিটার (১৯০ সেন্টিমিটার) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় এখানে পানি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম, ৪ সেন্টিমিটার।


তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে সোমবার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২৮ দশমিক ৯৭ মিটার, বিপদসীমা ২৯ দশমিক ৩১ মিটার। এই হিসাবে পানি বিপদসীমার মাত্র ৩৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যা চার পয়েন্টের মধ্যে বিপদসীমার সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান। ২৪ ঘণ্টায় এখানে পানি বেড়েছে ৭ সেন্টিমিটার।

পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলায় বৃষ্টিপাতও অব্যাহত রয়েছে। ১৯ জুলাই সকাল ৯টা থেকে ২০ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধা জেলায় ৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের ঢল ও স্থানীয় বৃষ্টিপাত একসঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 



  বিষয়:   বাড়ছে  নদীর পানি  ভাঙছে  পাড়  গাইবান্ধা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: