১ হাজার বোতল মাদক উদ্ধারের পর ২০০ বোতল দেখানোর অভিযোগ, ঘুষে ছাড়া পেল চালক?

তন্ময় আহমেদ নয়ন, লালমনিরহাট

সারাদেশ

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় ঘুষ গ্রহণ, উদ্ধার করা মাদক আত্মসাৎ এবং আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে

2026-07-25T18:18:02+00:00
2026-07-25T18:18:02+00:00
 
  শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
১ হাজার বোতল মাদক উদ্ধারের পর ২০০ বোতল দেখানোর অভিযোগ, ঘুষে ছাড়া পেল চালক?
তন্ময় আহমেদ নয়ন, লালমনিরহাট
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৬:১৮ পিএম 
ছবি : সময়ের আলো
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় ঘুষ গ্রহণ, উদ্ধার করা মাদক আত্মসাৎ এবং আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তথ্য ও অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়ও সামনে এসেছে।

গত ১৩ মে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় হাতীবান্ধা থানার এসআই মো. জাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বনচৌকি মৌজার বোর্ডেরহাট ব্রিজের উত্তর পাশে গুচ্ছগ্রামসংলগ্ন পাকা সড়কে একটি সাদা প্রাইভেটকার থেকে ১০০ বোতল স্কাফ ও ১০০ বোতল ফেয়ারড্রিল উদ্ধার করা হয়।

তবে দীর্ঘ অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই দিন হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের পূর্ব কাদমা বনচৌকি সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন হাতীবান্ধা থানার এসআই জাহিদুল ইসলাম, এসআই সঞ্জয়, এএসআই সাজেদুর রহমান, কনস্টেবল বেলাল হোসেন ও মো. জাহিদ হাসান। অভিযানের সময় একটি সাদা রঙের টয়োটা করোলা ক্রস গাড়িকে ধাওয়া করে কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর বালাপাড়া এলাকা থেকে আটক করা হয়। পরে গাড়িটি বোর্ডেরহাট বাজার হয়ে দৈখাওয়া বাজারে নিয়ে এলে সেখান থেকে ১ হাজার বোতল ভারতীয় স্কাফ ও ফেয়ারড্রিল সিরাপ এবং চালক রাসেল হোসেনকে আটক করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, আটকের পর ঘটনাস্থলেই সমঝোতার চেষ্টা শুরু হয়। অনুসন্ধানে পাওয়া গোপন ক্যামেরার ভিডিওতে নিজেকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মমিনুর ইসলাম বাবু ওরফে মেকার বাবু দাবি করেন, ওই রাতে বাদল আহমেদ জুয়েল নামে এক ব্যক্তির করোলা ক্রস গাড়িতে তিনি ১ হাজার বোতল স্কাফ ও ফেয়ারড্রিল তুলে দেন। গাড়িতে মাদকের মূল মালিক উপস্থিত না থাকলেও চালক রাসেল ইসলাম সেখানে ছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তিনি নিয়মিত এই ব্যবসা করতেন। স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বী মাদক ব্যবসায়ী ও পুলিশের সোর্স কমল রায় এবং টাট্টুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসআই জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের পুলিশ দল অভিযান চালায়। তার দাবি, ১ হাজার বোতল মাদক জব্দ হলেও মামলায় দেখানো হয় মাত্র ২০০ বোতল। বাকি ৮০০ বোতল সোর্স কমল ও টাট্টুর মাধ্যমে বিক্রি করা হয়।


একই ভিডিওতে মমিনুর ইসলাম বাবু আরও দাবি করেন, আটক চালক রাসেল হোসেন ও করোলা ক্রস গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রথমে ৭ লাখ টাকা দাবি করেন এসআই জাহিদুল ইসলাম। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা পুলিশের সোর্সের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হলে চালক ও গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়।

আরও অভিযোগ রয়েছে, পুরো ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে মামলার এজাহারে চালক রাসেল হোসেনকে পলাতক দেখানো হয়। একই সঙ্গে জব্দ তালিকায় করোলা ক্রসের পরিবর্তে একটি পুরোনো প্রটোন প্রাইভেটকারের উল্লেখ করা হয়। তবে মমিনুর ইসলাম বাবু ওরফে মেকার বাবু জানান, ওই প্রটোন প্রাইভেটকারটি তার ব্যক্তিগত। নিজেদের ব্যবসা চালু রাখার জন্যই তিনি গাড়িটি বিসর্জন দেন। গাড়িটির কাগজপত্র তার নামে না থাকায় সহজেই সেটি পুলিশকে দিয়ে দেন বলে দাবি করেন।

মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এজাহারের সাক্ষী গ্রাম পুলিশ কবির হোসেন জানান, রাত সাড়ে ৩টার দিকে তাকে ফোন করে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়। সেখানে একটি সাদা প্রাইভেটকার দেখতে পান। পরে ২০০ বোতল মাদক উদ্ধারের ঘটনায় তাকে সাক্ষী করা হয়। তিনি দাবি করেন, ঘটনাস্থল থেকে ড্রাইভারকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন গুচ্ছগ্রাম এলাকার অনেক উৎসুক মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং পুরো অভিযান ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়।

অপর সাক্ষী বোর্ডেরহাট বাজারের চৌকিদার ইসরাইল হোসেন বলেন, গাড়িটি বোর্ডেরহাট বাজার দিয়ে দুবার যাতায়াত করে। পরে আবাসনসংলগ্ন ব্রিজ পার হয়ে পাকা সড়কে অবস্থান নেয়। কৌতূহলবশত ঘটনাস্থলে গেলে পুলিশ তাকে জানায়, গাড়ি থেকে ২০০ বোতল মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর এসআই জাহিদুল তাকে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করতে বলেন।

ঘটনার বিষয়ে জানতে পাশের আবাসন (গুচ্ছগ্রাম) এলাকার প্রতিটি বাড়িতে যান প্রতিবেদক। সেখানে কেউ ঘটনাটি জানেন না বলে দাবি করেন। তবে আবাসনের বাসিন্দা মোছা. সোহরা বেগম (৫০) বলেন, পরদিন তারা শুনতে পান, পুলিশ ওই এলাকা থেকে মাদকসহ একটি গাড়ি আটক করেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযানে অংশ নেওয়া এএসআই সাজেদুর রহমান ও কনস্টেবল বেলাল হোসেন ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। অপরদিকে এসআই সঞ্জয়ও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।

মামলার বাদী এসআই জাহিদুল ইসলামের বক্তব্য নিতে তার বর্তমান কর্মস্থল আদিতমারী থানায় একাধিকবার সরেজমিনে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অভিযোগ জানার পর সংশ্লিষ্টদের হাতীবান্ধা থানা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে এবং একটি তদন্ত চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, ঘটনার এক মাসেরও বেশি সময় পর গত ১৮ জুন কালীগঞ্জ উপজেলার মিলন বাজার এলাকায় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযোগে উল্লেখিত সেই করোলা ক্রস গাড়ি থেকে আবারও মাদকসহ চালক রাসেল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় রাসেল হোসেন, পলাতক বাদল আহমেদ জুয়েলসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়।

অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া বাকি থাকলেও, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা এমন গুরুতর অভিযোগ জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   মাদক  বোতল  লালমনিরহাট  পুলিশ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: