সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি গানের রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে ভিডিওটিকে ঘিরে সমালোচনা ও তদন্ত কমিটি গঠনের ঘটনা ঘটেছে, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে তার প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি রাণী পাল। ভিডিওতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শাড়ি পরিহিত অবস্থায় তাকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। পেছনে বাজছিল একটি পুরনো বাংলা গান। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাংশ এটিকে আপত্তিকর ও অশ্লীল আঙ্গিকের বলে দাবি করে সমালোচনা শুরু করে। পরে বিষয়টি বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিতর্কের মধ্যে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রোববার সিলেট সফরে থাকা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, তার ব্যক্তিগত কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট নেই এবং বিষয়টি সম্পর্কে তিনি সাংবাদিকদের কাছ থেকেই প্রথম জেনেছেন। ভিডিওটি তিনি নিজে দেখেননি। তবে যাদের কাছ থেকে শুনেছেন, তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সেখানে কোনো অশ্লীলতা নেই বলে জেনেছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো অশ্লীলতা না থাকে, তাহলে শুধু গান বা এমন ভিডিও প্রকাশ করাকে আমি অন্যায় মনে করি না। তবে, ভিডিও না দেখে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল বলেন, ‘ভিডিওটি বিদ্যালয় চলাকালীন নয়, ছুটির পর ধারণ করা হয়েছিল।’
তিনি দাবি করেন, একজন সহকর্মীকে রিল বানানো শেখাতে গিয়েই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটি ধারণ করা হয়।
বিউটি রাণী পাল বলেন, ‘একজন সেরা প্রধান শিক্ষক হওয়ার আগে তিনি একজন মানুষ ও নারী। তারও ব্যক্তিগত জীবন আছে এবং নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাক্ষেত্রে আধুনিক কারিকুলাম নিয়ে কথা বললেও যদি সমাজের মানসিকতা সংকীর্ণ থাকে, তাহলে জাতির অগ্রগতি সম্ভব নয়।’
ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, তার ফেসবুক আইডিতে থাকা অধিকাংশ ভিডিওই শিক্ষার্থীদের পাঠদান, ছন্দে ছন্দে দিনের নাম ও অঙ্ক শেখানোর বিষয়ভিত্তিক। যে ভিডিও নিয়ে বিতর্ক, সেই ভিডিওটি ইতোমধ্যে তিনি নিজের প্রোফাইল থেকে মুছে ফেলেছেন।
বিতর্কের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বিউটি রাণী পালের প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন। পক্ষে বিপক্ষে ফেসবুকে চলছে লেখালেখি।
শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালী বলেন, ‘শিক্ষকও রক্তমাংসের মানুষ। তাদেরও আনন্দ-বেদনা প্রকাশের অধিকার রয়েছে। শালীনতা বা অশালীনতার মানদণ্ড কোনো নির্দিষ্ট পেশার মানুষের জন্য আলাদা হতে পারে না।’
শিক্ষক দিপা মণ্ডল প্রশ্ন তোলেন, ‘শাড়ি পরা অবস্থায় একজন সম্মানিত শিক্ষিকার সাধারণ হাঁটার ভিডিও কীভাবে অশালীন হতে পারে।’
কলেজশিক্ষক জান্নাত আরা খান পান্না লেখেন, ‘নাচ জানেন না বলে শুধু হাঁটছেন, কেউ যদি সেটিকেও নাচ মনে করেন, তাহলে তা নিয়ে তার কিছু বলার নেই।’ তিনি বিউটি রাণী পালের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন।
সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন টিপু তীর্যক মন্তব্য করে ফেসবুকে লিখেন, ‘এই শিক্ষিকা কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারেন।’
শিক্ষক বিজন বিহারী লেখেন, ‘প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পাল এগিয়ে যান।’
তবে, সবাই একই অবস্থানে নেই। মাওলানা খলিলুর রহমান তার আইডিতে লিখেছেন, ‘চাকরিজীবীদের নৈতিক, চারিত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সীমাবদ্ধতা ও দায়িত্ব থাকে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিউটি রাণী পালের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, বিউটি রাণী পাল ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ উপলক্ষে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।
সময়ের আলো/মহু