সীতাকুণ্ডে আধুনিক ট্রমা সেন্টার স্থাপনে সংসদে জোরালো দাবি

মেজবাহ উদ্দীন খালেদ, সীতাকুণ্ড

সারাদেশ

সীতাকুণ্ডে একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামসুন্নাহার। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন,

2026-07-27T17:58:49+00:00
2026-07-27T20:09:32+00:00
 
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সীতাকুণ্ডে আধুনিক ট্রমা সেন্টার স্থাপনে সংসদে জোরালো দাবি
মেজবাহ উদ্দীন খালেদ, সীতাকুণ্ড
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৫:৫৮ পিএম  আপডেট: ২৭.০৭.২০২৬ ৮:০৯ পিএম
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্স। ছবি : সময়ের আলো
সীতাকুণ্ডে একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামসুন্নাহার। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রতিদিন সড়ক ও শিল্প দুর্ঘটনায় বহু মানুষ আহত হলেও জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাবে অনেক প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।

সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন শেষে জাতীয় সংসদে বিষয়টি তুলে ধরে তিনি জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সীতাকুণ্ডের ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে। এই মহাসড়কে প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচলের কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনা বহু মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু সীতাকুণ্ডে এখনো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার গড়ে ওঠেনি। ফলে দুর্ঘটনায় আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দূরবর্তী হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হয়, যার ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

নারী সাংসদ বলেন, সীতাকুণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও দেশের অন্যতম ব্যস্ত যোগাযোগ করিডোর হওয়ায় এখানে ট্রমা সেন্টার স্থাপন সময়ের দাবি। মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল সমৃদ্ধ একটি ট্রমা সেন্টার অত্যন্ত জরুরি।

তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের প্রতি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানুষের জীবন রক্ষায় এ উদ্যোগ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। সীতাকুণ্ডবাসীর দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনায় আহত বহু মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কনটেইনারবাহী যান, কাভার্ডভ্যান ও ভারী শিল্পকারখানার পরিবহন একসঙ্গে চলাচল করায় সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বেপরোয়া গতি, অসতর্ক ওভারটেকিং এবং বিভিন্ন কারণে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

শুধু মহাসড়কই নয়, সীতাকুণ্ডে রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। এখানে জাহাজভাঙা শিল্প, স্টিল মিল, কেমিক্যাল কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ফলে কর্মস্থল দুর্ঘটনাও এ অঞ্চলের একটি নিত্য বাস্তবতা।

দুই হাইওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সীতাকুণ্ডে ৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২ জন নিহত এবং অন্তত ১২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ১ হাজার ১৭৩ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিদের প্রথম আশ্রয়স্থল সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হলেও সেখানে ট্রমাজনিত গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিশেষায়িত সেবা নেই। ফলে অধিকাংশ রোগীকেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করতে হয়।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার পরের প্রথম ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া গেলে মৃত্যুহার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু সীতাকুণ্ডে ট্রমা সেন্টার না থাকায় আহত রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে নিতে হয়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও জটিলতার কারণে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাপ হোসেন বলেন, সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এখানে একটি অত্যাবশ্যকীয় ট্রমা সেন্টার খুবই জরুরি। কিন্তু এটি না থাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চরম বিপাকে পড়ছে। ফলে আহতদের জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রায়শই তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে ট্রমা সেন্টার চালুর পাশাপাশি দীর্ঘ বছর ধরে শূন্য থাকা অর্থোপেডিক্স ডাক্তারের পদটিও পূরণ করা প্রয়োজন। হাসপাতালে ট্রমা সেন্টার চালু করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে গত মাসে জেলার মাসিক মিটিংয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে তিনি বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। অর্থোপেডিক্স চিকিৎসকের অভাবে দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসাকার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামেরও ঘাটতি রয়েছে।

কুমিরা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির রব্বানী বলেন, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ট্রমা সেন্টার চালু করা অত্যন্ত জরুরি।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, এই উপজেলার ওপর দিয়ে চলে গেছে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এই মহাসড়কে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু এখানে কোনো ট্রমা সেন্টার নেই। একটি ট্রমা সেন্টার চালু করা হলে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উভয় উপজেলার বাসিন্দারাই উপকৃত হতেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, জাহাজভাঙা শিল্পাঞ্চল এবং ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারণে সীতাকুণ্ডে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাই শুধু ট্রমা সেন্টারই নয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা, আধুনিক আইসিইউ ও বার্ন ইউনিট স্থাপন, নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ এবং শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগ করাও জরুরি।

তাদের ধারণা, একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে সড়ক দুর্ঘটনা, শিল্প দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ডে আহত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে কমবে প্রাণহানি, হ্রাস পাবে স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি এবং বাঁচবে অসংখ্য মূল্যবান জীবন। সীতাকুণ্ডবাসীর প্রত্যাশা, জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং দীর্ঘদিনের এই জনদাবি বাস্তবায়ন করবে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   সীতাকুণ্ড  মহাসড়ক  মৃত্যুফাঁদ  ট্রমা সেন্টার  জাতীয় সংসদ  দাবি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: