দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলতে পারে- এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায়। এ প্রেক্ষাপটে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর মালয়েশিয়া সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান শ্রমচুক্তি (এমওইউ) হালনাগাদ, নতুন নিয়োগ কাঠামো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আলোচনার মধ্য দিয়ে আগামী আগস্টে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অতীতের দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর না হলে শ্রমবাজার পুনরায় চালু হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সোমবার রাতে মালয়েশিয়া সফরে গেছেন। মন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। সফরে এ শ্রমবাজারের জট খুলতে মন্ত্রী মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামাননসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
নতুন করে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে এই সফরে দুই পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান এমওইউ নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যমান এমওইউতে কী কী পরিবর্তন বা আপডেট করা প্রয়োজন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিদ্যমান এমওইউ আপডেট করার কাজ শুরু হবে। সামনের আগস্টে এই ইস্যুতে ইতিবাচক বার্তা পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া ২০২৪ সালের মে মাস থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। মালয়েশিয়া তাদের দেশে বিদেশি কর্মী নিয়োগে দালালমুক্ত ও খরচ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে এআইভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। প্রথমে এআইভিত্তিক প্রস্তাবিত নতুন এই সিস্টেমের নাম ছিল বেস্টিনেট। কিন্তু গত ২৯ জুন এআইভিত্তিক নতুন প্ল্যাটফর্ম বেস্টিনেট নিয়ে একচেটিয়া আধিপত্যের উদ্বেগ প্রকাশ করেন ৭ জন মালয়েশীয় সাংসদ।
এক যৌথ বিবৃতিতে মালয়েশিয়ার সাংসদরা তাদের সরকারকে প্রস্তাবিত বেস্টিনেটের বাস্তবায়ন স্থগিত করার আহ্বান জানান এবং সতর্ক করেন যে, স্বচ্ছতা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোর সমাধান না করা হলে এটি দেশের বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থায় আরেকটি বেসরকারি একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করতে পারে। এরপর চলমান জুলাইয়ের শুরুতে মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা দেশটির জনশক্তি আমদানির দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত করেছে।
সেই সঙ্গে প্রস্তাবিত বেস্টিনেটের পরিবর্তে বিদ্যমান এফডব্লিউসিএমএসের (ফরেন ওয়ার্কাস সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) চালু করেছে এবং ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া ও কেস-বাই-কেস অনুমোদন বাতিল করেছে।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানন বলেন, গত ১ জুলাই মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদেশি কর্মীদের জন্য ওয়ান স্টপ সেন্টারের (ওএসসি) ব্যবস্থাপনা এখন থেকে সম্পূর্ণরূপে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আসবে। বিদেশি কর্মী নিয়োগে সুশাসন জোরদার করার এবং একই সঙ্গে শ্রমনির্ভর শিল্পগুলোর কার্যক্রম যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের একটি কৌশলগত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকার বিদেশি কর্মী কোটা ব্যবস্থাপনাকেও মন্ত্রণালয়ের অধীনে কেন্দ্রীভূত করেছে। এখন সব আবেদন একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে জমা দিতে হবে, যার ফলে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া এবং প্রতিটি আবেদনের পৃথক অনুমোদনের বিষয়টি দূর হয়েছে।
মালয়েশিয়া মূলত বিদেশ থেকে দুই ধরনের কর্মী সংগ্রহ করে, যাদের মধ্যে একটি হচ্ছে কম দক্ষতাপূর্ণ কর্মী। তারা কলিং ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটে সেখানে যায়। আরেকটি হচ্ছে দক্ষ কর্মী। তাদের এমপ্লয়মেন্ট পাস বা ইপি ভিসা দেওয়া হয়। মালয়েশিয়া সরকার তাদের দেশে প্রবাসী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যা গত জুন থেকে কার্যকর হয়েছে।
দেশটি মূলত অতীতের মতো বিশাল আকারের কর্মী নিয়োগ দিতে চায় না। তারা নিজেদের স্থানীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে চায় এবং বিদেশি কর্মীর অনুপাত কমাতে চায়। এ জন্য আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ বিদেশি কর্মী নিয়োগ ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য স্থির করেছে এবং সেই মোতাবেক কাজ করছে দেশটি।
মালয়েশিয়া মূলত বিশ্বের প্রায় ১৫টি দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার থেকেই বেশি নিয়োগ করে। দেশটি মূলত প্ল্যানটেশন (পাম অয়েল), উৎপাদন খাত, সার্ভিস ও ট্যুরিজম এবং কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে কর্মী নিয়ে থাকে।
অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, সবশেষ প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে জনশক্তি খাত নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু উভয় পক্ষের দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ। শতভাগ দুর্নীতি নির্মূল না করে এ শ্রমবাজার চালু করা ঠিক হবে না। দুর্নীতি নির্মূল না করে এই বাজার চালু করলে তা আবারও মুখ থুবড়ে পড়বে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি