অবহেলার পলি সরিয়ে কি জাগবে ‘রংপুর ইপিজেড’

কায়সার রহমান রোমেল

সারাদেশ

তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, করতোয়া ও ঘাঘট- এই ৪ নদী প্রতিবছর গাইবান্ধার চরে নতুন পলি ফেলে, জন্ম দেয় নতুন সম্ভাবনার। কিন্তু প্রায়

2026-07-30T15:38:40+00:00
2026-07-30T15:41:52+00:00
 
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
শিল্পায়নের চিমনির অপেক্ষায় আর কতকাল
অবহেলার পলি সরিয়ে কি জাগবে ‘রংপুর ইপিজেড’
কায়সার রহমান রোমেল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ৩:৩৮ পিএম  আপডেট: ৩০.০৭.২০২৬ ৩:৪১ পিএম
প্রস্তাবিত ‘রংপুর ইপিজেড’। ছবি : সংগৃহীত
তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, করতোয়া ও ঘাঘট- এই ৪ নদী প্রতিবছর গাইবান্ধার চরে নতুন পলি ফেলে, জন্ম দেয় নতুন সম্ভাবনার। কিন্তু প্রায় ২৬ লাখ মানুষের এই জেলায় সেই পলির স্তরে জমেছে আরেকটি জিনিস, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ও তার বাস্তবায়নের মাঝের দীর্ঘ দূরত্ব। ২০০৪ সালে রংপুর চিনিকল বন্ধ হওয়ার পর থেকে জেলায় আর কোনো বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। সেই শূন্যতা ঘোচানোর সম্ভাবনা নিয়ে এখন আলোচনায় গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ, যেখানে গড়ে উঠতে যাচ্ছে দেশের দশম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ‘রংপুর ইপিজেড’।

গোবিন্দগঞ্জ সদর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের প্রায় ১ হাজার ৮৪২ একর জমির মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ৪৫০ একর বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) কে হস্তান্তর করা হয়েছে। জায়গাটি যোগাযোগের দিক থেকেও সুবিধাজনক- হিলি স্থলবন্দর ৩২ কিলোমিটার, বগুড়া বিমানবন্দর ৩৪ কিলোমিটার ও মহিমাগঞ্জ রেলস্টেশন সেখান থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে। ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করা বেপজা এখন জাতীয় রফতানির প্রায় ১৭ শতাংশের উৎস। গত সাড়ে চার দশকে সংস্থাটি ৭২৯ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ টেনেছে। এই ধারাবাহিকতায় উত্তরাঞ্চলে বিনিয়োগ ছড়াতে গাইবান্ধায় নতুন ইপিজেডের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার সুফল ছড়াবে বগুড়া, জয়পুরহাট ও রংপুরেও।


তবে প্রকল্পটির পেছনে আছে দীর্ঘ এক সংঘাতের ইতিহাস। ১৯৬২ সালে সাঁওতাল ও বাঙালিদের কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে গড়ে তোলা হয় সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার। শর্ত ছিল, আখ চাষ বন্ধ হলে জমি মূল মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সেই শর্ত মানা হয়নি বলে অভিযোগ তুলে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে খামারের একাংশে বসতি স্থাপন করেন সাঁওতালরা। একই বছরের ৬ নভেম্বর উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ ও চিনিকল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে, যাতে শ্যামল হেমব্রম, রমেশ টুডু ও মঙ্গল মার্ডি নামের ৩ সাঁওতাল নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হন। এ ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং আদিবাসী অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটেই সরকার ওই জমিতে ইপিজেড স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০১৯ সালে বেপজা তা চূড়ান্ত করে। কিন্তু সাঁওতাল সম্প্রদায় শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, পৈতৃক জমি ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং ২০১৬ সালের সংঘর্ষের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হোক। কৃষিজমিতে শিল্পাঞ্চল গড়ার সিদ্ধান্তকেও অনেকে যুক্তিসংগত মনে করেন না। কারণ, কৃষিই এখনো এই অঞ্চলের বহু মানুষের প্রধান জীবিকা। ২০১৬ সাল থেকেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি এবং সংবাদ সম্মেলনসহ ধারাবাহিকভাবে নানা কর্মসূচি পালন করে সাঁওতালরা প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন।


অন্যদিকে, গোবিন্দগঞ্জের একটি বড় অংশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ইপিজেড দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার। গত ২ বছরে একাধিকবার মানববন্ধন, মশাল মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ হয়েছে। তাদের বক্তব্য, কর্মসংস্থানের অভাবে তরুণদের বহু বছর ধরে ঢাকা বা বিদেশে পাড়ি দিতে হচ্ছে। বিক্ষোভের মুখে প্রশাসন বারবার আশ্বাস দিলেও জমি অধিগ্রহণ ও স্থানীয় জটিলতার কারণে পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নির্মাণ এখনো শুরু হয়নি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এলাকার আড়াই শতাধিক একর জমির অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান, তবে প্রকল্প কবে পুরোদমে চালু হবে তা এখনো অস্পষ্ট। ইতোমধ্যে এপেক্স ও কাজী ফার্মের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আশপাশে জমি কিনেছে, যা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের একটি ইঙ্গিত।

এই বিতর্ক আসলে গাইবান্ধার দীর্ঘদিনের অবহেলারই একটি প্রতিচ্ছবি। বালাসীঘাট-বাহাদুরাবাদ সেতুর দাবি এখনো কাগজে বন্দি, অথচ একই রুটে ১৫০ কোটি টাকার ফেরিঘাট টার্মিনাল নাব্যতা সংকটে অকেজো। ভাঙা যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবার অভাব এবং নদীভাঙনের বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পর্যটনের মতো অব্যবহৃত সম্ভাবনাও।


বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়ন, কৃষি, যোগাযোগ ও পর্যটন- এই ৪ খাতে সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া জেলার টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষায় থাকা লাখো তরুণ-তরুণী ও পূর্বপুরুষের জমির অধিকার নিয়ে অনড় সাঁওতাল সম্প্রদায়- দুই পক্ষের বক্তব্যেই আছে যৌক্তিকতা। 

বিশ্লেষকদের মতে, স্বচ্ছ আলোচনা, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করেই কেবল এগিয়ে নেওয়া উচিত এই প্রকল্প। না হলে, যে জমি হতে পারত উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনাবিন্দু, তা রয়ে যাবে অমীমাংসিত বিরোধের আরেকটি অধ্যায় হয়ে। গাইবান্ধার আকাশে শিল্পের চিমনি ওঠা নির্ভর করছে একটিমাত্র প্রশ্নের ওপর- রংপুর ইপিজেড কি ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতার পথ ধরে এগোবে, নাকি থেমে থাকবে আরও কয়েক দশকের অপেক্ষায়?

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   রংপুর ইপিজেড  গাইবান্ধা  চিমনি  শিল্পায়ন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: