‘তুই আমার কেমন বন্ধু, তা আলাদা করে বলার কিছু নেই। তোর মতো একজন বন্ধু পেয়ে আমি আল্লাহর কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির এক কোণে বসে বিশ্ব বন্ধু দিবসে প্রিয় বন্ধুর উদ্দেশে এভাবেই চিঠি লিখছিলেন যূথী। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন ৩০ জুলাই। ব্যস্ত নগরজীবনে বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘদিন দেখা নেই, নিয়মিত কথাও হয় না। সেই না-বলা অনুভূতিগুলো কাগজে তুলে ধরে যেন নিজেকেই একটু গুছিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি।
শুধু যূথী নন, তার চারপাশে আরও অনেক তরুণ-তরুণী বিশ্ব বন্ধু দিবস উপলক্ষে লিখছিলেন প্রিয় মানুষদের উদ্দেশে চিঠি। কেউ বিদেশে থাকা বন্ধুকে, কেউ বহু বছর দেখা না হওয়া শৈশবের সঙ্গীকে।
যূথীর পাশেই বসে বাবা-মা ও প্রিয় বন্ধুর জন্য চিঠি লিখছিলেন মেহেরুন নেছা আইরিন। লিখতে লিখতেই কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে তার।
তিনি বলেন, আজ বাবা-মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। আমি তাদের থেকে অনেক দূরে থাকি। কয়েক মাস পরপর দেখা হয়, কিন্তু প্রতিদিন একসঙ্গে বসে খাওয়া কিংবা গল্প করার সুযোগ আর হয় না। রাজ্জাক লিখছিলেন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু শাওনের উদ্দেশে।
তিনি বলেন, আমাদের বন্ধুত্ব ১৪ বছরের। এতদিন আমরা একই শহরে ছিলাম। এবার প্রথমবারের মতো আলাদা শহরে আছি। শাওন রাজশাহীতে, আমি ঢাকায়।
বন্ধুকে স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, এমন কোনো পরিস্থিতি নেই, যেখানে সে আমার পাশে ছিল না। হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ সবসময় আমরা একসঙ্গেই থেকেছি। এমনও সময় গেছে, আমরা একই বিছানায় থেকেছি, একে অন্যকে খাইয়েছি। বন্ধুত্ব আসলে এভাবেই জীবনের অংশ হয়ে যায়।
জন্মের পর পরিবার আমাদের প্রথম আশ্রয় হলেও জীবনের নানা বাঁকে কিছু মানুষ রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই হয়ে ওঠেন আপনজন। সুখে-দুঃখে, সাফল্য-ব্যর্থতায় কিংবা সংকটের মুহূর্তে তারাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। এই অমূল্য সম্পর্কের নামই বন্ধুত্ব।
প্রতি বছর আগস্ট মাসের প্রথম রোববার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব বন্ধু দিবস। দিনটি শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের নয়; বরং জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলোর একটি বন্ধুত্বকে নতুন করে উপলব্ধি করারও উপলক্ষ। বন্ধুত্বের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। কারও কাছে বন্ধু মানে শৈশবের খেলার সঙ্গী, কারও কাছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আড্ডার সাথি, আবার কারও কাছে কর্মজীবনের সহযোদ্ধা। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, ঠিকানা বদলায়; কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব বদলে যায় না। বছরের পর বছর যোগাযোগ না থাকলেও হঠাৎ দেখা হলে মনে হয়, যেন সময় থেমে ছিল।
প্রযুক্তির এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত ‘বন্ধু’ যোগ হলেও প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা খুব বেশি বাড়ে না। কারণ বন্ধুত্বের ভিত্তি কখনো লাইক, মন্তব্য কিংবা অনলাইন উপস্থিতি নয়। এর ভিত্তি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন আন্তরিক বন্ধু মানুষের মানসিক সুস্থতার অন্যতম বড় শক্তি। কঠিন সময়ে একজন বন্ধুর একটি আশ্বাস, একটি সাহস জোগানো বাক্য কিংবা নীরব উপস্থিতিও ভেঙে পড়া মানুষকে আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। তাই বন্ধুত্ব শুধু একটি সামাজিক সম্পর্ক নয়; এটি মানবিকতা ও মানসিক সুস্থতারও অন্যতম ভিত্তি।
ব্যস্ততা আর প্রতিযোগিতার এই সময়ে আমরা ক্রমেই একে অন্যের জন্য সময় হারিয়ে ফেলছি। বিশ্ব বন্ধু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে খোঁজ নিতে হয়, সময় দিতে হয়, অভিমান ভাঙতে হয় এবং প্রয়োজনে নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়াতে হয়। একটি ফোনকল, একটি ছোট্ট বার্তা কিংবা হঠাৎ দেখা করতে যাওয়াও বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
বন্ধুত্ব শুধু দুই ব্যক্তির সম্পর্ক নয়; এটি সমাজে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলারও একটি শক্তিশালী ভিত্তি। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ বিশ্বাসের এই বন্ধনই গড়ে তোলে আরও মানবিক পৃথিবী।
বিশ্ব বন্ধু দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তা প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
বরং যে বন্ধু কঠিন সময়ে নিঃস্বার্থভাবে পাশে থেকেছেন, যার কাঁধে মাথা রেখে চোখের জল ফেলা গেছে, কিংবা যিনি আপনার সাফল্যে নিজের সাফল্যের মতো আনন্দিত হয়েছেন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই হতে পারে এই দিনের সবচেয়ে বড় উদযাপন।
বন্ধুত্বের কোনো শেষ নেই। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে, নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠবে। কিন্তু যে বন্ধুত্ব বিশ্বাস, ভালোবাসা ও মানবিকতার আলোয় গড়ে ওঠে, তা সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজীবন হৃদয়ে বেঁচে থাকে। বিশ্ব বন্ধু দিবসের অঙ্গীকার হোক- বাঁচুক বন্ধুত্ব, দূরত্ব নয়; আরও দৃঢ় হোক হৃদয়ের সেতুবন্ধ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও