মানুষের পূর্বপুরুষরা কীভাবে ঘুমাতেন, সে সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা খুবই সীমিত। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ধারণা ছিল— শিকারি ও খাদ্য সংগ্রাহকরা সূর্যাস্তের পর ঘুমিয়ে পড়তেন এবং সূর্যোদয়ের সঙ্গে জেগে উঠতেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই ধারণা অনেকটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
তবে বর্তমান সময়ের শিকারি-সংগ্রাহক বা খাদ্যসংগ্রহকারী জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। মানবজাতির বিবর্তনের ৯৫ শতাংশেরও বেশি সময় কীভাবে ঘুম কেটেছে, তার সবচেয়ে ভালো ধারণা পাওয়া যায় এসব জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন থেকে। আর গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণভাবে তাদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা খুবই কম। বিবিসি।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের ঘুমবিষয়ক গবেষক জেরোম সিগেল তানজানিয়ার হাজা, বলিভিয়ার তসিমানে এবং নামিবিয়ার সান জনগোষ্ঠীর ঘুমের ধরন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, শিকারি-সংগ্রাহকদের তাদের নিজস্ব ভাষায় ‘ঘুমাতে কখনো সমস্যা হয় কি না’ জিগ্যেস করলে অনেক সময় তারা প্রশ্নটির ধারণাই বুঝতে পারেন না।
মজার বিষয় হলো, শিল্পায়িত সমাজের মানুষের তুলনায় এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ সাধারণত কম সময় ঘুমান এবং রাতে বেশি বার জেগে ওঠেন। তারপরও ঘুম নিয়ে তাদের অভিযোগ খুব কম।
তা হলে তাদের রহস্যটা কী?
আধুনিক মানুষের ঘুমের ধরন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে। সেগুলো আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান জীবনেও ভালো ঘুমের জন্য কিছু কার্যকর শিক্ষা দিতে পারে।
দিনের আলোয় থাকুন
ভালো ঘুমের অন্যতম ভিত্তি হলো আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি। এটি শরীরকে জানান দেয় কখন জেগে থাকতে হবে এবং কখন ঘুমাতে হবে। এই জৈবিক ঘড়িকে সঠিক ছন্দে রাখতে আলো, তাপমাত্রাসহ পরিবেশের বিভিন্ন সংকেত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু আধুনিক জীবনযাপন এই স্বাভাবিক ছন্দকে অনেক সময় ব্যাহত করে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্লিপ অ্যান্ড হিউম্যান ইভল্যুশন ল্যাব’-এর পরিচালক ডেভিড স্যামসনের ভাষায়, আমরা এমন পরিবেশে বসবাস করছি, যা মানুষের এই প্রাচীন সময়-নির্ধারণী ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হলো আলো। তাই ঘুম থেকে ওঠার পর যত দ্রুত সম্ভব দিনের আলোয় কিছুটা সময় কাটানো উপকারী। বিশেষ করে শিল্পায়িত সমাজে বসবাসকারী মানুষের জন্য দিনের আলো শুধু দেহঘড়ি ঠিক রাখতেই সাহায্য করে না, রাতে কৃত্রিম আলোর নেতিবাচক প্রভাবও কিছুটা কমাতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমানোর আগে কয়েক ঘণ্টা খুব উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকালে ঘুম আসতে প্রায় ১০ মিনিট দেরি হতে পারে। তবে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত উজ্জ্বল আলো পেলে সেই প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
তাই সুযোগ পেলেই দিনের আলোয় কিছু সময় কাটানো যেতে পারে। ট্রেনের বদলে কয়েক মিনিট হেঁটে যাওয়া, ঘরের বদলে বাইরে বসে দুপুরের খাবার খাওয়া কিংবা জানালার পাশে বসে কাজ করা— ছোট এসব অভ্যাসও কাজে লাগতে পারে।
তাপমাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলুন
ঘুমের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাপমাত্রা। গরম আবহাওয়াতেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত তাপমাত্রা কমে এবং দিনের বেলায় আবার বাড়ে।
গবেষক জেরোম সিগেল মনে করেন, ঘুমের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার ভূমিকা আমরা অনেক সময় অবমূল্যায়ন করি। তার গবেষণায় দেখা গেছে, হাজা জনগোষ্ঠীর মানুষ সাধারণত সূর্যাস্তের কয়েক ঘণ্টা পর ঘুমাতে যান এবং সূর্য ওঠার আগেই জেগে ওঠেন। তবে তাদের ঘুমের সময় আলোর চেয়ে তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আধুনিক জীবনে আমরা এমন ঘরে থাকি যেখানে দিন-রাত প্রায় একই তাপমাত্রা বজায় থাকে। এর পরিবর্তে ঘুমানোর আগে ঘরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে দেওয়া, রাতে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমানোর ব্যবস্থা করা কিংবা জানালা খুলে দেওয়া কিছুটা উপকার করতে পারে।
শুধু রাত-দিন নয়, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গেও ঘুমের ধরন বদলায়। শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের সময় যখন দীর্ঘ ও উষ্ণ থাকে, তারা তুলনামূলক কম ঘুমান। আর দিন ছোট ও ঠান্ডা হলে ঘুমের সময় বেড়ে যায়। অর্থাৎ প্রতি রাতে একই পরিমাণ ঘুম হবে— এমন প্রত্যাশা না রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ঋতুর সঙ্গে ঘুমের সময় কিছুটা পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক।
ঘুমের আগে নিজেকে ধীরে ধীরে শান্ত করুন
শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে সন্ধ্যা নামলেই মানুষ ঘুমাতে চলে যায় না। বরং তারা কাজের ব্যস্ততা থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের সরিয়ে নেয়। আগুনের পাশে বসে গল্প করা, একসঙ্গে সময় কাটানো কিংবা পরস্পরের সঙ্গে দেখা করা— এসবই তাদের রাতের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের অংশ।
নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ অ্যালিসা ক্রিটেনডেন দুই দশক ধরে তানজানিয়ার হাজা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেছেন। তার মতে, সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। দিনের বেশিরভাগ সময় তাদের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড ঘোরে খাবার সংগ্রহ, সন্তান দেখাশোনা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে।
কিন্তু রাত নামলে এসব কাজ শেষ হয়ে যায়। শুরু হয় অপেক্ষাকৃত শান্ত ও সামাজিক সময়। দিনের কর্মব্যস্ত সময়ের সঙ্গে রাতের এই বড় পার্থক্য শরীর ও মস্তিষ্ককে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দেয়।
আধুনিক মানুষের জন্যও এর শিক্ষা আছে। ঘুমানোর ঠিক আগে অফিসের ই-মেইল দেখা, বিল পরিশোধ করা কিংবা কাজের চাপ নিয়ে ব্যস্ত থাকার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা উপকারী হতে পারে।
একা নয়, মানুষের সঙ্গে থাকুন
শিকারি-খাদ্য সংগ্রাহকদের রাতের জীবন শুধু কাজের বাইরে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর বড় অংশই সামাজিক। ক্রিটেনডেন একে বলেছেন ‘নাইটটাইম কো-অপারেটিভ নিস’— রাতের পারস্পরিক সহযোগিতামূলক পরিসর। এসব সমাজে অনেক মানুষ একই ঘরে, এমনকি একই জায়গায় ঘুমান। সেখানে শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়, সন্তান, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশীও থাকতে পারেন। অর্থাৎ ঘুমের সময়ও সামাজিক সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না।
আধুনিক সমাজেও এর কিছু প্রভাব দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, একা ঘুমানোর তুলনায় অন্য কারও সঙ্গে ঘুমালে অনেকের মনে হতে পারে যে তারা ভালো ঘুমিয়েছেন। আবার দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একাকিত্ব অনুভব করেন, তাদের ঘুমও তুলনামূলক খারাপ হতে পারে।
তাই রাতে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, একসঙ্গে খাবার খাওয়া কিংবা কোনো সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া— এসব শুধু মানসিকভাবে ভালো লাগার বিষয় নয়; ভালো ঘুমের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
‘পারফেক্ট ঘুম’-এর পেছনে ছুটবেন না
গবেষকদের কাছ থেকে বারবার একটি বিষয় উঠে এসেছে— শিকারি-সংগ্রাহক এবং অন্যান্য শিল্পায়ন-পূর্ব সমাজের মানুষ গড়ে আধুনিক মানুষের তুলনায় কম ঘুমান এবং রাতে বেশি জেগে ওঠেন। নৃতত্ত্ববিদ ক্রিটেনডেনের মতে, আধুনিক সমাজে টানা আট ঘণ্টা ঘুমের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে অনেকটাই অবাস্তব।
বরং ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি করাই কখনো কখনো ঘুমকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। আজ আমরা জীবনের প্রায় সবকিছুই পরিমাপ ও নিখুঁত করার চেষ্টা করি— খাবার, শরীরচর্চা, উৎপাদনশীলতা, এমনকি ঘুমও। কিন্তু প্রতিটি রাত একইরকম হবে, এমন কোনো প্রয়োজন নেই।
বিবর্তনীয় নৃতত্ত্ববিদ গান্ধী ইয়েতিশ বলেন, প্রতিদিন মানুষ একই খাবার খায় না। তা হলে প্রতিদিন ঠিক একইভাবে ঘুমানোর প্রত্যাশা কেন থাকবে? অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা নিয়মিত ঘুমের সমস্যা অবহেলা করার বিষয় নয়। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কিন্তু ঘুমের ক্ষেত্রে কিছুটা ওঠানামা স্বাভাবিক।
কখনো আমরা বেশি প্রাণবন্ত থাকি, কখনো একটু কম। কোনো দিন মনোযোগ বেশি থাকে, কোনো দিন কম। কারণ আমরা যন্ত্র নই— আমরা মানুষ। আর ভালো ঘুমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি হয়তো এই সত্যটিকে মেনে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও