সাইবার সন্ত্রাস রোধে সরকারের নতুন উদ্যোগ

বিশেষ প্রতিনিধি

জাতীয়

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি এবং মতপ্রকাশের সুযোগকে অভূতপূর্বভাবে সম্প্রসারিত করেছে। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গুজব,

2026-08-01T13:51:53+00:00
2026-08-01T13:53:20+00:00
 
  শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬,
১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
সাইবার সন্ত্রাস রোধে সরকারের নতুন উদ্যোগ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১:৫১ পিএম  আপডেট: ০১.০৮.২০২৬ ১:৫৩ পিএম
‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ছবি : প্রতীকী
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি এবং মতপ্রকাশের সুযোগকে অভূতপূর্বভাবে সম্প্রসারিত করেছে। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গুজব, অপতথ্য, মানহানি, সাইবার বুলিং, ডিজিটাল চাঁদাবাজি এবং সংগঠিত অপপ্রচারের নতুন বাস্তবতা। এসব অপরাধ কেবল ব্যক্তির সম্মানহানি করছে না; সামাজিক স্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। এ উদ্যোগের জন্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী প্রশংসার দাবিদার।

সংশোধিত আইনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি এবং হেয়প্রতিপন্ন করার মতো কর্মকাণ্ডকে সুস্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ানো হচ্ছে শাস্তির পরিধি। সংশোধিত আইনে নতুন একটি ধারা (২৬/ক) যুক্ত করতে বলা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, সাইবার মাধ্যমে গুজব বা অপতথ্য ছড়ালে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও, অডিও, ছবি বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ডিজিটাল কনটেন্ট প্রচারকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি আরও কঠোর করার উদ্যোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।


বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় অংশ ব্যক্তিগত যোগাযোগের পরিবর্তে চরিত্রহনন, অপপ্রচার, ব্ল্যাকমেইল এবং চাঁদাবাজির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সংঘবদ্ধ কিছু চক্র দেশ-বিদেশ থেকে পরিচালিত হয়ে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক এমনকি সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার পাশাপাশি অর্থ আদায়ের অভিযোগও দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অপপ্রচারের কারণে ব্যক্তি, পরিবার এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অধিকাংশ ভুক্তভোগী কার্যকর আইনি প্রতিকার পান না। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মামলা গ্রহণ কিংবা তদন্তেও অনীহা দেখা যায়। ফলে, অপরাধীরা দায়মুক্তির সুযোগ পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি শুধু আইন প্রয়োগের দুর্বলতাই প্রকাশ করে না, বরং সাইবার অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে।

সাইবার বুলিং এখন একটি গুরুতর সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নারী, কিশোর-কিশোরী এবং তরুণদের ওপর এর প্রভাব ভয়াবহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান, কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য বিকৃতভাবে প্রচার এবং ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতনের কারণে বহু মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। একইসঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, উপাসনালয়, জাতীয় ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়েও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার সমাজে বিভাজন, উত্তেজনা ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।


অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, এসব নিয়ন্ত্রণ কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী? বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও এমনটি বলে না। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, একইসঙ্গে অন্যের সুনাম, জননিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনে আইনি সীমাবদ্ধতার সুযোগ রেখেছে। অর্থাৎ, স্বাধীন মতপ্রকাশ কখনোই মিথ্যা, বিদ্বেষ, মানহানি কিংবা সহিংসতা উসকে দেওয়ার অবাধ অধিকার নয়।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোও এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং অন্যান্য দেশের বিভিন্ন আইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশও যদি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তা নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিজিটাল পরিসরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে, আইন প্রণয়নই চূড়ান্ত সমাধান নয়; আইনের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত প্রয়োগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেন এই আইন প্রকৃত সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, গঠনমূলক সমালোচনা কিংবা বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়- সেদিকেও সরকারকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল চাঁদাবাজি, গুজব, অপতথ্য এবং সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ আজ সময়ের দাবি। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সেই বিবেচনায় সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগকে নাগরিক নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ ডিজিটাল বাংলাদেশে দায়িত্বশীল, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক সাইবার পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   সাইবার  সন্ত্রাস  রোধ  সরকার  উদ্যোগ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: