দেশের চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে নতুন করে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের নতুন কূপ থেকে এ গ্যাস সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আরও কয়েকটি কূপ থেকে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কূপগুলো উৎপাদনে এলে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে দেশে গ্যাসের মোট চাহিদার তুলনায় এ পরিমাণ অতিরিক্ত সরবরাহ খুব বেশি নয়। ফলে নতুন গ্যাস যুক্ত হলেও সংকট পুরোপুরি কাটবে কি না, তা নির্ভর করবে চাহিদা ও সরবরাহের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) সূত্রে জানা গেছে, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আজ শনিবার ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে। কূপটির খননকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক কাজ শেষে এটিকে উৎপাদনে নেওয়া হচ্ছে।
এরপর ধাপে ধাপে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের আরও কয়েকটি কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিতাস-২৯ ও ৩০ নম্বর কূপের কাজও এগিয়ে চলছে। এসব কূপ উৎপাদনে গেলে প্রতিটি কূপ থেকে দৈনিক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে।
এ ছাড়া তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপের খননকাজ চলছে। কূপটি সফল হলে সেখান থেকেও গ্যাস পাওয়ার আশা করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। তিতাসের পাশাপাশি বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের একটি কূপ থেকেও গ্যাস উত্তোলনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে আগামী তিন থেকে চার মাসে এসব কূপ থেকে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে এর মজুদ আনুমানিক দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তিতাস-৩১ একটি অনুসন্ধানমূলক কূপ হওয়ায় এর মাধ্যমে নতুন গ্যাসের মজুদ আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে কূপটির মাধ্যমে আরও প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাসের মজুদ যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ মজুদের পরিমাণ নিশ্চিত করতে কূপটির খনন শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই নতুন মজুদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ক্রমেই কমে আসায় নতুন কূপ খননের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু চাহিদা বাড়ার কারণে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
দেশে গ্যাসের ঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান— দুই দিকেই জোর দিচ্ছে সরকার।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, নতুন কূপগুলো থেকে উৎপাদন শুরু হলে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, পুরোনো কূপের উন্নয়ন, এলএনজি আমদানি এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, বিজিএফসিএলের আওতাধীন তিতাস-২৮ নম্বর কূপ আগামীকাল (আজ শনিবার) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পরপরই কূপটি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এতে আমদানি-নির্ভরতার চাপ কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
‘তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম জসীম উদ্দিন বলেন, তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ প্রায় এক মাস আগে শেষ হয়েছে। কূপটির গভীরতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। উদ্বোধনের পরপরই এটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে।
তিনি জানান, প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাসসহ বেশ কয়েকটি কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস-২৮ নম্বর কূপ আগামীকাল (আজ) উৎপাদনে যাবে। অন্য কূপগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজিএফসিএলের গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, তিতাস-৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপের খননকাজ চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কূপটির খনন গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৫ হাজার ৬০০ মিটার, যা প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, গভীরতার কারণে কূপটির খনন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগছে।
কোনো ধরনের ভূতাত্ত্বিক জটিলতা দেখা না দিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ করার আশা রয়েছে। কূপটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
মাহমুদুল নবাব জানান, তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে কূপটির লগিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চলছে। এসব কাজ শেষ করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। তিতাস-২৯ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কূপটি থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বিজিএফসিএল।
অন্যদিকে আগামী কয়েক মাসে নতুন গ্যাস যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি আরও বড় পরিমাণ গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ রয়েছে। ফলে শীত মৌসুমে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে চাহিদা কতটা বাড়ে এবং দেশীয় উৎপাদন ও আমদানির প্রকৃত সরবরাহ কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর পরিস্থিতির উন্নতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও