১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চমাধ্যমিক শেষ বর্ষের ৭৩ শতাংশ ছেলে এবং ৮৪ শতাংশ মেয়ে ভবিষ্যতে বিয়ে করবে বলে প্রত্যাশা করে। কিন্তু ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা যায়, সেই প্রবণতা অনেকটাই বদলে গেছে। বিয়ে করতে আগ্রহী মেয়েদের হার কমে ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ছেলেদের মধ্যেও বিয়ের ইচ্ছে কমেছে, তবে তুলনামূলক কম হারে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীর হার ৮২ শতাংশ থেকে কমে ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিবর্তনের কারণ বিশ্লেষণ করেছেন স্টেফানি কুন্টজ তার ‘ফর বেটার অ্যান্ড ওয়ার্স’ বইয়ে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘কাউন্সিল অন কনটেম্পোরারি ফ্যামিলিজের’ গবেষণা ও জনশিক্ষা বিভাগের পরিচালক ও ‘ম্যারেজ : অ্যা হিস্ট্রি’সহ একাধিক বইয়ের লেখক। তার মতে, উনিশ ও বিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা, আইন, সরকারি নীতি, প্রেম, নারী-পুরুষের সামাজিক ভূমিকা এবং যৌনতা নিয়ে মানুষের ধারণার পরিবর্তন- সব মিলিয়ে এটি ঘটেছে।
স্টেফানি কুন্টজ দেখিয়েছেন, একসময় সমাজের নানা নিয়মকানুন এবং বাস্তবতা মানুষকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করত, অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যও করত। এসব নিয়মই ঠিক করে দিত সংসারে স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকা কী হবে। একইসঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদকে নিরুৎসাহিত করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব নিয়মের প্রভাব কমে যায়। একইসঙ্গে অবিবাহিত থাকাকেও সমাজ আর নেতিবাচকভাবে দেখেনি। ফলে, বিয়ে না করার সামাজিক চাপও অনেক কমে যায়।
একসময় আমেরিকান সমাজে ‘সেপারেট স্ফিয়ার্স’ নামে একধরনের পিতৃতান্ত্রিক ধারণা প্রচলিত ছিল। এই ধারণা অনুযায়ী, পুরুষের কাজ ছিল বাইরে গিয়ে উপার্জন করা, আর নারীর কাজ ছিল ঘর-সংসার সামলানো। এই ব্যবস্থার ফলে অনেকক্ষেত্রেই নারীরা রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতেন।
বিংশ শতাব্দীতে এসে এই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। তবে, তখনও সমাজে পুরুষদের শক্তিশালী ও নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত মানুষ হিসেবে দেখা হতো। অন্যদিকে, নারীদের পরিচয় তখনও ছিল কোমল, যত্নশীল ও আবেগপ্রবণ মানুষ হিসেবে।
এসময় যুক্তরাষ্ট্রে নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও কিছুটা পরিবর্তন আসে। ভিক্টোরীয় যুগে যৌনতা নিয়ে কথা বলাকে অশোভন মনে করা হতো। পরে সেই ধারণা বদলে যায়। পুরুষদের জন্য যৌন আকর্ষণ গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে। আর নারীদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হতো, তারা যেন নিজেদের আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করেন।
একই সময় যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডেটে যাওয়া’ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কুন্টজের মতে, ১৯২০-এর দশকের শেষ দিকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। তখন নারী-পুরুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আগের মতো দেখা হতো না। তবে কুন্টজ নিজেই স্বীকার করেছেন, এই মূল্যায়নে হয়ত কিছুটা অতিরঞ্জন রয়েছে।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ ইতিহাসের অন্য যেকোনও সময়ের তুলনায় কম বয়সে বিয়ে করত। সে সময় ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত অবিবাহিত থাকতেন মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ। তখন বিয়ে ছিল প্রায় সবার জীবনের স্বাভাবিক অংশ। একইসঙ্গে তখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘পুরুষই পরিবারের উপার্জনকারী’ মডেল।
১৯৭০-এর দশকের পর পরিস্থিতি আবার পাল্টাতে শুরু করে। শ্রমিক ইউনিয়নের শক্তি কমে যায়। উৎপাদনশিল্পে চাকরি কমে আসে। মজুরি বাড়ার গতি থেমে যায়। অন্যদিকে, বাড়ি ভাড়া ও কেনার খরচ দ্রুত বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে বিয়ের ওপরও। অনেক শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত আমেরিকান বিয়ে পিছিয়ে দিতে শুরু করেন। কেউ কেউ আবার বিয়েই করেন না। অনেকের কাছে ঋণমুক্ত হওয়া বা আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া বিয়ের আগে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
কুন্টজের মতে, ১৯৭০-এর দশকের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও ব্যস্ত জীবন অনেক সময় অর্থসংকটের মতোই দাম্পত্য সম্পর্কে চাপ তৈরি করে।
বইয়ের শেষ অংশে কুন্টজ বর্তমান সময়ের বিবাহপ্রথা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, সুখী ও দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্যের অন্যতম শর্ত হলো সংসারের কাজ দুজন মিলে ভাগ করে নেওয়া। মজার বিষয় হলো, গৃহস্থালির সব কাজের মধ্যে বাসন ধোয়া নিয়েই নাকি সবচেয়ে বেশি ঝগড়া হয়। বিশেষ করে যখন এই দায়িত্ব একজনের ওপরই পড়ে।
গবেষণায় আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। বিবাহিত মানুষ অবিবাহিতদের তুলনায় পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী বা সহকর্মীদের সঙ্গে কম সময় কাটান। তারা অন্যদের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে কম সাহায্য নেন, আবার নিজেরাও কম সাহায্য করেন।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা দাম্পত্য জীবনকেও আরও সুখী করতে পারে। অর্থাৎ, শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়, আশপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কও একটি সুখী সংসারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতা থেকে কুন্টজ, দম্পতিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি একে বলেন ‘বেনেভোলেন্ট অ্যাট্রিবিউশন’। সহজ করে বললে, সঙ্গীর কোনো অপছন্দের আচরণ দেখলেই সেটিকে তার খারাপ স্বভাব বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বরং অনেক সময় ভাবা উচিত, হয়ত কাজের চাপ, ক্লান্তি বা সাময়িক কোনো সমস্যার কারণেই তিনি এমন আচরণ করছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সঙ্গীকে বোঝার চেষ্টা করেন, তাদের দাম্পত্য জীবন সাধারণত বেশি সুখী ও সন্তোষজনক হয়।
কুন্টজের মতে, বিয়ে ও পরিবার কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে, সেই ইতিহাস জানা এবং সঙ্গীর প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব রাখা- এই দুই বিষয় দাম্পত্য জীবনের অনেক অপ্রয়োজনীয় ভুল বোঝাবুঝি ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। এতে পরিবার নিয়ে মানুষের পুরনো মূল্যবোধ ও নতুন প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াও সহজ হয়।
লেখা : অধ্যাপক গ্লেন সি. অল্টশুলার
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/মহু