সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ‘ভারতের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিচার— ১২ বছরের এক কন্যাশিশুকে সাতজন মিলে ধর্ষণের পর ঘটনাস্থলেই তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।’ ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টগুলোর মন্তব্যে দেখা যায়, অনেক ব্যবহারকারীই দাবিটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছেন।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত দাবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন। ভারতে ঘটনাস্থলেই সাতজনকে ফাঁসি কার্যকর করার কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওটি মহারাষ্ট্রে এক পরিবারের ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের নিয়ে পুলিশের ক্রাইম সিন রি-ক্রিয়েশন (ঘটনাস্থল পুনর্নির্মাণ) কার্যক্রমের সময় ধারণ করা।
ভাইরাল হওয়া ৫৩ সেকেন্ডের ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, হাতকড়া পরা এবং মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা কয়েকজন ব্যক্তিকে পুলিশি নিরাপত্তায় ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ভিডিওটির কয়েকটি কী-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ অনুসন্ধান করে ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য হিন্দুসহ একাধিক গণমাধ্যমে গত ১৫ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেসব প্রতিবেদনে ভিডিওটির প্রকৃত ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের নাসিক জেলার ভাবালিবাঁধ এলাকায় ঘটে। সেখানে বেড়াতে যাওয়া একটি পরিবারের এক নারী সদস্যকে উত্ত্যক্ত করাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে অভিযুক্তরা পরিবারের সদস্যদের মারধর করে এবং তাদের গাড়ি ভাঙচুর করে।
ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তের অংশ হিসেবে পরে তাদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এবং কীভাবে পুরো ঘটনা ঘটেছিল, তা পুনর্নির্মাণ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার ধারাবাহিকতা, অভিযুক্তদের অবস্থান এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের উদ্দেশ্যেই এই ক্রাইম সিন রি-ক্রিয়েশন পরিচালনা করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে পাওয়া কোনো গণমাধ্যমের প্রতিবেদন কিংবা পুলিশের দাপ্তরিক তথ্যসূত্রে কোথাও ১২ বছরের কোনো শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা বা অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলেই ফাঁসি কার্যকর করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ভারতের জাতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের (ANI) ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ৩ মিনিট ৪ সেকেন্ডের মূল ভিডিওর সঙ্গেও ভাইরাল ক্লিপটির হুবহু মিল পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, ফেসবুকে ছড়ানো ভিডিওটি মূল ভিডিওরই একটি সংক্ষিপ্ত অংশ, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি জুড়ে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা হয়েছে।
সব তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ‘১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে ঘটনাস্থলেই সাতজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে’— এমন দাবির কোনো ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওটি মহারাষ্ট্রে এক পরিবারের ওপর হামলা ও নারীকে উত্ত্যক্ত করার মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের নিয়ে পুলিশের তদন্ত-সংক্রান্ত ঘটনাস্থল পুনর্নির্মাণের দৃশ্য, যা ভিন্ন দাবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে