গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন চুক্তিতে আগের চেয়ে বড় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে এতে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কিছুটা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ন্যাটোর সদস্য নয়— এমন কোনো দেশকে সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে এ চুক্তি করেন। কয়েক মাস ধরে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি ও উত্তেজনার পর এই চুক্তি হলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৫১ সালের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর নতুন চুক্তিটি করা হয়েছে। ওই চুক্তির মাধ্যমে ন্যাটোর প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সেনা মোতায়েনের সুযোগ পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
নতুন চুক্তিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত হয়েছে। এগুলো হলো— ন্যাটো সদস্য নয় এমন কোনো দেশকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করতে না দেওয়া, গ্রিনল্যান্ডের দুটি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেখানে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কয়েক দশক ধরে গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক স্পেস বেসে সীমিত পরিসরে অবস্থান করছে। ট্রাম্প শুক্রবার বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ‘বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি’ গড়ে তুলবে।
তবে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান মনে করেন, সেখানে নতুন করে খুব বেশি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নেই। তার হিসাবে, নতুন করে ৫০ জনেরও কম সেনা সেখানে যোগ হতে পারে।
চুক্তিতে ন্যাটোর বাইরের দেশগুলোর গ্রিনল্যান্ডে সামরিক প্রভাব ঠেকানোর বিষয়টি মূলত চীন ও রাশিয়াকে লক্ষ্য করেই করা হয়েছে বলে মনে করেন ক্যানসিয়ান।
ট্রাম্প এর আগে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। নতুন চুক্তিতে ট্রাম্পের পরিকল্পিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থা চালু হতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলে নতুন নৌপথ তৈরি হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন এ অঞ্চলের দিকে বাড়তি নজর দিচ্ছে। এসব নৌপথ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় আর্কটিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বিষয়ক প্রতিরক্ষা বিভাগের সাবেক উপসহকারী সচিব আইরিস ফার্গুসন বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় ক্ষতি করেছে। তবে নতুন চুক্তিটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেখানে প্রবেশাধিকার থাকবে— এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছে। ফার্গুসনের মতে, আগের চুক্তিতে এই বিষয়টি স্পষ্ট না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এটি একটি সমস্যা ছিল।
নতুন চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডের নারসারসুয়াক ও মেস্টারসভিগে দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কথা রয়েছে। তবে সেখানে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম রাখার জন্য বড় ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন ফার্গুসন।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন চুক্তি এবং এ অঞ্চলে ন্যাটোর বাড়তে থাকা ভূমিকা সম্মিলিত নিরাপত্তা জোরদার করবে।
তবে চুক্তি নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য জিন শাহীনের দাবি, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে কয়েক মাস হুমকি দেওয়ার পর ট্রাম্প যে চুক্তি করেছেন, তাতে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিনল্যান্ডের আগের প্রতিরক্ষা সম্পর্কই আবার ফিরে এসেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ