জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক দাবি তুলে ধরেছেন। তবে এসব দাবির কয়েকটির সঙ্গে বাস্তব তথ্যের অসঙ্গতি রয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দাবি যাচাই করে সেগুলোর প্রকৃত তথ্য তুলে ধরেছে সিএনএন।
৮টি যুদ্ধ বন্ধের দাবি
ট্রাম্প বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ৮টি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, কসোভো-সার্বিয়া, রুয়ান্ডা-ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান ও গাজার সংঘাতের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ইসরায়েল-ইরান এবং মিসর-ইথিওপিয়ার কথাও বলেন।
তবে তালিকাটির সবগুলোকে যুদ্ধ বলা যায় না। মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে বিরোধ মূলত একটি বাঁধ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে, সেখানে সরাসরি যুদ্ধ হয়নি। একইভাবে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময় কসোভো ও সার্বিয়ার মধ্যেও কোনো যুদ্ধ চলছিল না।
রুয়ান্ডা ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর সংঘাতও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতা করলেও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকায় সেখানকার পরিস্থিতিকেও পুরোপুরি যুদ্ধের অবসান বলা যাচ্ছে না।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বক্তব্য
ট্রাম্প দাবি করেন, একসময় বলা হয়েছিল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে। তিনি আরও বলেন, পৃথিবী উষ্ণ না হয়ে ঠান্ডা হচ্ছিল বলে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ নাম পরিবর্তন করে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ করা হয়েছে।
তবে এসব বক্তব্যের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্যের মিল নেই। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বলতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে বাড়াকে বোঝায়। অন্যদিকে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা জলবায়ু পরিবর্তন বলতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃষ্টিপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠসহ জলবায়ুর বিভিন্ন পরিবর্তনকে বোঝানো হয়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছরই ছিল সর্বশেষ ১১ বছর। এর মধ্যে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছর।
২০১৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ একটি জলবায়ু প্রতিবেদনে ১২ বছরের মধ্যে মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হয়নি। সেখানে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ
ট্রাম্পের দাবি, তার প্রশাসন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। তবে এই পরিমাণের পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বড় বিনিয়োগের ঘোষণার পরিমাণ প্রায় ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। এর সবগুলোই আবার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নয়। কিছু ঘোষণার সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জড়িত।
ফেডারেল তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩২ বিলিয়ন ডলার। তাই ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের দাবিটি যাচাইযোগ্য তথ্যের তুলনায় অনেক বেশি।
মার্কিন গোলাবারুদের মজুত
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গোলাবারুদ রয়েছে এবং দেশটি রেকর্ড পরিমাণে গোলাবারুদ উৎপাদন করছে।
তবে মার্কিন সরকারের সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিরক্ষা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধে গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে কৌশলগত মজুত কমেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কিছু বাধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মজুতও কমেছে। তাদের হিসাবে, ২০২৫ সালের জুন থেকে এসব গোলাবারুদের প্রায় অর্ধেক থেকে দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত পাঁচ বছর লাগতে পারে। তবে প্রতিরক্ষা বিভাগ গোলাবারুদের ঘাটতির বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
ওয়াশিংটনে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমার দাবি
ট্রাম্প বলেছেন, তার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধের হার ৮৭ শতাংশ কমেছে। কিন্তু স্থানীয় পুলিশের পরিসংখ্যান এই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সোমবার পর্যন্ত ওয়াশিংটনে ১৫ হাজারের বেশি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় মোট অপরাধ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ ট্রাম্পের দাবি করা ৮৭ শতাংশ নয়।
তবে কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যেমন ২০২৫ সালে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ছিল চারটি, যা ২০২৬ সালে নেমে এসেছে একটিতে। হত্যার ঘটনাও সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় কমেছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ কমার হার দিয়ে পুরো শহরের অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ