নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (এআরটি) এখন ঢাকা-ওয়াশিংটন দুদেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি। আগামী দিনগুলোতে দুপক্ষকে এই এআরটি চুক্তি বাস্তবায়ন করতে দেখা যাবে। সদ্য সমাপ্ত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গরের সফরেও মূল ফোকাস পেয়েছে এআরটি।
ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে গত শনিবার বিশেষ দূত সার্জিও গর বলেছেন যে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার এবং দুপক্ষের অংশীদারিত্ব আরও উন্নত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অগ্রাধিকার এবং একসঙ্গে কাজ করে আমরা বাস্তব ফলাফল অর্জন করতে পারি। যার ধারাবাহিকতায় আগামী মঙ্গলবার মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের কমান্ডার অ্যাডমিরাল স্টিফেন কোহলার তিন দিনের সরকারি সফরে বাংলাদেশে আসছেন।
এই সফরে অ্যাডমিরাল কোহলার ২২ সদস্যের একটি নৌ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ স্থানীয় প্রায় ২৫টি শিল্প এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শীর্ষস্থানীয় প্রায় ৪৫ জন ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ বা প্রথম সারির কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে আসবেন।
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সদ্য সমাপ্ত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গরের সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ সফরটি অত্যন্ত ভালো হয়েছে। এই সফরে মার্কিন এই বিশেষ দূতের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের বৈঠকের মূল বিষয় ছিল বাণিজ্য। মূলত দুপক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন সম্পর্কে টানাপোড়েন চললেও গত অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় থেকে সম্পর্ক উন্নত হওয়া শুরু করে। যার ধারাবাহিকতায় দুপক্ষই সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা করছে। দুপক্ষের মধ্যে সই করা এআরটি চুক্তির সূত্র ধরেই ঢাকা ওয়াশিংটন থেকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে কৌশলী হয়ে কাজ করছে।
যেমন বিশেষ দূত গরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ডের আরোপ বিষয়টি উত্থাপন করে ঢাকার কূটনীতিকরা জানিয়েছে যে এমন ব্যবস্থা বাংলাদেশি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা, যা দুপক্ষের বাণিজ্য-বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ দূত গর বৈঠকে বিষয়টি মনোযোগের সঙ্গে শুনছেন এবং ঢাকার কূটনীতিকরা বিশ্বাস করে- আগামীতে এই বিষয়েও সুখবর আসতে পারে।
মূলত এআরটি চুক্তি কেন্দ্র করে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, তরল গ্যাস, উড়োজাহাজ ক্রয় (সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে) করছে, এতে ওয়াশিংটন খুশি। এই সফরের বৈঠকগুলোতে ঢাকার পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ভারত বা চীন বা অর্থনৈতিক করিডোর বা ভূ-রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি।
যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের বাইরে কোনো আলাপ করেনি। সম্পর্কের এই পর্যায়ে সন্তুষ্ট হওয়ায় এবং বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও উন্নত করতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণের জন্য ঝুঁকির মাত্রা কমিয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করে এবং তাদের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ ভ্রমণে উৎসাহিত করতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার লেভেল কমিয়েছে।
যে কারণে বিশেষ দূত গরের সফরের পরপরই বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন রোববার বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (অ্যামচ্যাম) নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি সম্প্রসারণ, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া এবং বাংলাদেশে একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ যাতে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ প্যাক্স সিলিকায় অংশীদার হতে পারে সে জন্য বিশেষ দূত উদ্যোগ নেবেন বলে বৈঠকে জানিয়েছেন।
প্যাক্স সিলিকা হলো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের নেতৃত্বে চালু করা একটি কৌশলগত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং এর সঙ্গে যুক্ত সাপ্লাই চেইন সুরক্ষার ওপর কেন্দ্রীভূত। যা গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে অর্থনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গের নেতৃত্বে চালু হয়। প্যাক্স অর্থ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি আর সিলিকা বলতে সিলিকন ডাই-অক্সাইড বোঝায়, যা পরিশোধন করে সিলিকন তৈরি হয়।
সিলিকনই সেমিকন্ডাক্টর চিপের প্রধান কাঁচামাল এবং আধুনিক কম্পিউটিং ও এআইয়ের ভিত্তি। প্রথম দিকে এই ফোরামে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ অংশ নেয়। ২০২৬ সালের জুনের দ্বিতীয় সামিটে আরও অনেক দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এতে যোগ দেয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৪টি স্বাক্ষরকারী এবং তাইওয়ান নন-সাইনটরি অংশগ্রহণকারী হিসেবে নীতিগুলো সমর্থন করেছে।
এদিকে বাংলাদেশ সফরে এসে মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে গত শুক্রবার সাক্ষাৎ করেন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিছুই জানত না। ঢাকার একজন কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে বলেন, ভারতীয় দূতের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি মন্ত্রণালয় জানত না। তবে এতে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। এই সাক্ষাত নিয়ে ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসের কাছে জানতে চাইলে একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, ওই সাক্ষাতের সময় তারা কেউ উপস্থিত ছিলেন না এবং সাক্ষাতের পরও হাইকমিশনারের সঙ্গে দেখা হয়নি। কারণ তিনি দিল্লি গেছেন।
মার্কিন বিশেষ দূতের সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তার জন্য এটা একটা অনুসন্ধানমূলক সফর ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে। অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে যেমন ট্রেড (বাণিজ্য), ইনভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগ), টেকনোলজি। বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে আগামী দশকে এশিয়ায় একটি সম্ভাব্য ‘টেকনিক্যাল হাব’ হতে পারে। বাংলাদেশ সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারে এবং সেই সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে, ইত্যাদি। তারপরে ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক বিভিন্ন পজিশন, ইন্টারন্যাশনাল পজিশন যেগুলো আমরা একসঙ্গে নিতে পারি। সো, ইন টার্মস অব আ হোল রেঞ্জ অব থিংস ওয়াজ ডিসকাসড। তবে খুব বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, একটা সময় যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় প্রিজম দিয়ে বাংলাদেশকে দেখত বলে মনে করা হতো। সার্জিও গরের সফর আমাদের অনেকটা সে সময়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বহুলাংশে যুক্তরাষ্ট্রচালিত হলেও সময় সময় বাংলাদেশ তার প্রায়োরিটি অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় এলিমেন্ট যোগ করতে পেরেছে। এই সফর আবার যেন সেই সমীকরণে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করে কোনো সক্রিয় উদ্যোগ অনুপস্থিত বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থটুকু পূরণ করতে বাংলাদেশ উদগ্রীব হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের অপেক্ষা না করে নিজ প্রায়োরিটি অনুযায়ী আলোচ্যসূচি নিয়ে এগুতে হবে। না হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা জরুরি এবং এই চুক্তির সম্ভাব্য ফল-আউটগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো মোকাবিলায় মনোযোগী হতে হবে। পাশাপাশি সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আছে এমন চুক্তি ও সম্ভাবনার ব্যাপারে অধিকতর সতর্ক হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, সার্জিও গরের সফর আশা করি বাংলাদেশ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে ভাবতে তাগাদা দিবে এবং বাংলাদেশকে আশু ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে সজাগ করবে। সমান্তরালভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাবে।
সময়ের আলো/এসএকে