একজন মা, পাঁচটি কন্যাসন্তান। সংসারে নেই স্বামীর সহায়তা, নেই নিয়মিত খোঁজখবর কিংবা ভরণপোষণ। তার ওপর স্বামীর নির্মম নির্যাতনের ক্ষত। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল বিনা আক্তারের।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বাবুপুর গ্রামের এই নারী জানতেন না, আগামী দিনের সংসার কীভাবে চলবে। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেবেন কীভাবে, সেই চিন্তাই ছিল নিত্যসঙ্গী। অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছিল তার। এমন কঠিন সময়ে তার পাশে দাঁড়াল উপজেলা প্রশাসন।
বিনা আক্তারের অসহায়ত্বের কথা জানতে পেরে তাকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে নেন ত্রিশালের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী। মুখোমুখি বসে তিনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন বিনার জীবনের গল্প। স্বামীর নির্যাতন, সংসারে স্বামীর অনুপস্থিতি, সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব না নেওয়া সবকিছুই বিস্তারিত জানতে চান তিনি।
একপর্যায়ে ইউএনও বিনাকে প্রশ্ন করেন, প্রশাসন কীভাবে আপনার পাশে দাঁড়ালে আপনি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন?
প্রশ্নটির উত্তর যেন বিনার কাছে আগে থেকেই জানা ছিল। তিনি জানান, সেলাইয়ের কাজ জানেন। একটি সেলাই মেশিন পেলে বাড়িতে বসেই কাজ করতে পারবেন। নিজের হাতে উপার্জন করে অন্তত পাঁচ মেয়ের মুখে খাবার তুলে দিতে পারবেন। হয়তো একটু একটু করে ঘুরেও দাঁড়াতে পারবেন।
বিনার এই কথাটুকুই বদলে দিল পরিস্থিতি। কোনো দীর্ঘ প্রক্রিয়া নয়, কোনো অপেক্ষাও নয়। ইউএনও আরাফাত সিদ্দিকী তাৎক্ষণিকভাবে তার অফিসের একজন কর্মচারীকে একটি সেলাই মেশিন কিনে আনার নির্দেশ দেন।
যেই কথা, সেই কাজ। বিনা আক্তার যখন ইউএনওর কার্যালয়ে বসে আছেন, তখনই সেলাই মেশিন কিনে আনা হয়। পরে সেই সেলাই মেশিনটি তার হাতে তুলে দেন ইউএনও নিজেই।
হয়তো একটি সেলাই মেশিনের আর্থিক মূল্য খুব বেশি নয়। কিন্তু বিনা আক্তারের কাছে এটি যেন একটি নতুন জীবনের দরজা খুলে দেওয়ার মতো।
এটি শুধু একটি সেলাই মেশিন নয়, এটি পাঁচ সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার একটি সম্ভাবনা। এটি একজন অসহায় মায়ের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ। এটি নির্ভরতার অন্ধকার থেকে স্বাবলম্বিতার পথে হাঁটার প্রথম পদক্ষেপ।
সেলাই মেশিনটি হাতে নিয়ে বিনা আক্তারের চোখে হয়তো ছিল কষ্টের দীর্ঘ দিনের জল, আবার সেই চোখেই ফুটে উঠেছিল নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। যে মা এতদিন পাঁচ সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, সেই মায়ের হাতেই এখন নিজের ভাগ্য বদলের একটি হাতিয়ার।
উপজেলা প্রশাসনের এই তাৎক্ষণিক ও মানবিক উদ্যোগে স্থানীয় সচেতন মহলও প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, অসহায় মানুষকে শুধু সাময়িক সহায়তা দেওয়ার চেয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি করে দেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিনা আক্তারের গল্প তাই শুধু একজন অসহায় নারীর গল্প নয়। এটি একজন মায়ের লড়াইয়ের গল্প, যিনি ভেঙে পড়েননি। পাঁচ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে চান। আর সেই ঘুরে দাঁড়ানোর পথে প্রথম সহায়তার হাতটি বাড়িয়ে দিল ত্রিশাল উপজেলা প্রশাসন।
একটি সেলাই মেশিন হয়তো একটি পরিবারের সব কষ্ট দূর করতে পারবে না। কিন্তু একজন মায়ের হাতে যখন নিজের উপার্জনের পথ তুলে দেওয়া হয়, তখন সেই ছোট্ট সহায়তাই হয়ে উঠতে পারে একটি পরিবারের নতুন শুরুর গল্প।
সময়ের আলো/আতা