গণঅভ্যুত্থানের ‘ব্লক রেইড’, ৩ সমন্বয়ককে হাসপাতাল থেকে তুলে নেওয়ার দিন

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে দেশজুড়ে সহিংসতা, প্রাণহানি ও গ্রেফতারের ঘটনা চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২৬

2026-08-05T11:10:16+00:00
2026-08-05T16:20:54+00:00
 
  রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
গণঅভ্যুত্থানের ‘ব্লক রেইড’, ৩ সমন্বয়ককে হাসপাতাল থেকে তুলে নেওয়ার দিন
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১০ এএম  আপডেট: ০৫.০৮.২০২৬ ৪:২০ পিএম
বাঁ থেকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদার। ছবি : সংগৃহীত
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে দেশজুড়ে সহিংসতা, প্রাণহানি ও গ্রেফতারের ঘটনা চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২৬ জুলাই ঢাকার বাসিন্দারা মুখোমুখি হন‘ব্লক রেইড’ নামে পরিচিত ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযানের। এ দিন আন্দোলনের ৩ সমন্বয়ককে তুলে নেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে।

ভোররাত থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহুসংখ্যক গাড়ি প্রবেশ করতে দেখা যায়। কখনও দিনের আলোয়, কখনও গভীর রাতে পুরো একটি এলাকা ঘিরে ফেলে বাহিনীর সদস্যরা। বিভিন্ন প্রবেশপথে অবস্থান নেওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট বাড়িগুলোর ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কোথাও কোথাও সড়কবাতিও নিভিয়ে দেওয়া হয়। কিছু সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত সদস্য এসে অভিযানে যোগ দেন।

এরপর শুরু হয় বাড়ি বাড়ি তল্লাশি। শিক্ষার্থীসহ বাসিন্দাদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা হয়। অনেকের অভিযোগ ছিল, অভিযানের সময় দুর্ব্যবহার ও মারধরের ঘটনাও ঘটে। কারও মোবাইলে আন্দোলনের ছবি, ভিডিও বা সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া গেলে কিংবা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে তাকে আটক করা হয়। কোথাও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে না পেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, অভিযানের সময় হেলিকপ্টার থেকে সার্চলাইট ফেলে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও আতঙ্ক সৃষ্টি করে।


২৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই ব্লক রেইডের পাশাপাশি দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও অব্যাহত ছিল। সেদিন পর্যন্ত সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ অন্তত ৫৫৫টি মামলা করে এবং গ্রেফতারের সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। একই দিনে চট্টগ্রাম থেকেও ৩০ শিক্ষার্থীকে গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়।

এই পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন। কেউ কেউ ঢাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।

সেই সময় ব্লক রেইড নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ডেইলি স্টার। যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া এলাকার এক শিক্ষার্থী পত্রিকাটিকে জানান, পুলিশ তাদের বাড়ির প্রতিটি কক্ষ তল্লাশি করে। অভিযানের আগে পুরো ভবনের ছবি তোলা হয় এবং ঘটনাটি কাউকে না জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, যে ছয়তলা ভবনে তিনি থাকতেন, সেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয়। গভীর রাতে অভিযান শেষ হওয়ার আগে কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্টে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। আশপাশের অনেক বাসিন্দা ভয়ে নিজেদের ঘরের বাতি নিভিয়ে রাখেন, যাতে বাইরে থেকে মনে হয় ফ্ল্যাটগুলো খালি।


একই এলাকার এক বাড়ির মালিক জানান, বারান্দা থেকে তিনি দেখেছেন কয়েকজন পুলিশ ২ ব্যক্তিকে মারধর করছেন। তাদের ওঠবস করানো হয় এবং ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আন্দোলন বা প্রতিবাদে অংশ নেবেন না- এমন কথা বলতেও বাধ্য করা হয়।

মাতুয়াইলের এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি ছিল, অভিযানে স্থানীয় ছাত্রলীগের কর্মীরাও পুলিশের সঙ্গে ছিলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনে কারা সক্রিয় এবং কোন বাড়ি থেকে আন্দোলনকারীদের খাবার বা পানি দেওয়া হয়েছে- এসব তথ্য ছাত্রলীগের কর্মীরাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেন।

একই ধরনের অভিযান চালানো হয় মিরপুর-১২ ডিওএইচএস এলাকাতেও। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী সেখানে বসবাস করায় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ওই এলাকায় তল্লাশি চালান।

ভোররাতে শাহীনবাগ এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযান চলার সময় স্থানীয়রা হেলিকপ্টারকে নিচু দিয়ে উড়তে এবং সার্চলাইট ব্যবহার করতে দেখেছেন বলে জানান। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দারাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন।

তাদের মতে, ২৫ জুলাই দিনের বেলায় পুলিশ স্থানীয়দের বিকেল ৫টার পর বাইরে না থাকার নির্দেশ দিয়েছিল। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়তে থাকে এবং পরে অভিযান শুরু হয়।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ভবনের ওপর থেকে মোবাইল ফোনে অভিযান ধারণ করার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তার দিকে গুলি ছোড়েন বলে ভিডিওতে দাবি করা হয়।

মহাখালী এলাকাতেও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ব্লক রেইড পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। আতঙ্কে অনেক পরিবার সেদিন নিজেদের বাসা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়।

এদিন বিকেলে আন্দোলনের নেতৃত্বেও বড় ধরনের ঘটনা ঘটে। রাজধানীর ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৩ সমন্বয়ক- নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে নিজেদের হেফাজতে নেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সাদাপোশাকে একদল ব্যক্তি হাসপাতালে প্রবেশ করে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তাদের নিয়ে যান। পরে রাতে ডিবির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থেই সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

এর আগেও এই ৩ সমন্বয়ককে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির পর নাহিদ ইসলামকে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ২১ জুলাই ভোরে তাকে পূর্বাচলে ফেলে যাওয়া হয়। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং পরে তিনি গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।


একইভাবে ১৯ জুলাই আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকেও তুলে নেওয়া হয়। পাঁচ দিন পর, ২৪ জুলাই, আসিফকে হাতিরঝিল এবং বাকেরকে ধানমন্ডি এলাকায় রেখে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তারাও গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও ২৬ জুলাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ দিন। ৬ দিন নীরব থাকার পর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি দাবি করেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় নিরীহ মানুষ হত্যার জন্য বিএনপি ও জামায়াত দায়ী। একইসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, পুলিশ কিংবা সাধারণ মানুষ কোনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে না।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশু থেকে শুরু করে রাস্তায় বের হওয়া সাধারণ মানুষও নিহত হয়েছেন।’

তার দাবি ছিল, এসব ঘটনা জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার ফল এবং বিষয়গুলো নিয়ে তারা খোঁজখবর নিচ্ছেন।

একই দিনে আরেক অনুষ্ঠানে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘সরকার দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করেনি, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেছে।’

পরবর্তীতে এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয় এবং জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে বহুল ব্যবহৃত একটি মিমে পরিণত হয়।

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   গণ-অভ্যুত্থান  ব্লক রেইড  সমন্বয়ক  হাসপাতাল  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: