গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক জুয়ার আসর, যা রাতভর চলতে থাকে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ফরডাবু-ছয়গুটি’ খেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আসরগুলোর নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে সংগঠিত মাদক ব্যবসা ও চড়া সুদে ঋণ প্রদানের চক্র। জুয়া, মাদক ও সুদের এই যোগসাজশে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, বাড়ছে চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, সন্ধ্যা পার হতে না হতেই মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে জুয়াড়িরা জড়ো হতে শুরু করেন নির্দিষ্ট কিছু স্থানে। রাত যত বাড়ে, খেলাও তত জমে ওঠে। জুয়ার আসরের পাশাপাশি চলে মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সেবন। রাতভর জুয়াড়িদের আনাগোনা, মাদকসেবী ও কারবারিদের উৎপাত এবং মোটরসাইকেলের শব্দে অতিষ্ঠ আশপাশের বাসিন্দারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার অন্তত ৪টি এলাকায় নিয়মিত বসছে এই জুয়ার আসর- ফরিদপুর ও ভাতগ্রাম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী খোদাবক্স গ্রামের খরকার দিঘির দক্ষিণ পাড়; সাদুল্লাপুর-নলডাঙ্গা সড়কের জোড়া ঘাঘট ব্রিজসংলগ্ন দামোদরপুর ইউনিয়নের জামুডাঙ্গা গ্রামে নদীর বাঁধের পূর্ব পাশের চর; ধাপেরহাট ইউনিয়নের বকসীগঞ্জ হাইস্কুলের পেছনে নলেয়া নদীর পাড় এবং ফরিদপুর ইউনিয়নের মহেশপুরসংলগ্ন মাঝিপাড়া।
অভিযোগ আছে, এসব স্থানে ত্রিপলের সামিয়ানা টাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গভীর রাত পর্যন্ত নিয়মিত চলছে জুয়ার আসর। বৃষ্টি নামলেও থামে না খেলা, বরং জুয়াড়িদের মোটরসাইকেল ও অন্যান্য বাহন রাখার জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা।
জুয়ার আসরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সংগঠিত এক সুদের কারবার। সঙ্গে আনা সব টাকা হারিয়ে কোনো জুয়াড়ি নিঃস্ব হয়ে পড়লে, খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তাকে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া হয়। এই ঋণের প্রক্রিয়াও রীতিমতো সংগঠিত- জুয়া পরিচালনা কমিটির লোকজন ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সই-স্বাক্ষর নিয়ে টাকা ধার দেন, যাতে পরে আদায়ে কোনো সমস্যা না হয়।
জামালপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও স্কুলশিক্ষক সাইদুর রহমান জানান, ‘তার বাড়ির পাশের গ্রাম জামুডাঙ্গায় ঘাঘট নদীর বাঁধের পূর্ব পাশের চরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই জুয়া। জুয়া খেলে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনেককেই জুয়ার বোর্ডে ১ লাখ টাকায় দৈনিক এক হাজার টাকা সুদে নেওয়া ধার শোধ করতে গরু-ছাগল ও ঘরবাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ, পুলিশকে বারবার জানিয়েও এর কোনো স্থায়ী প্রতিকার মেলেনি।’
উপজেলা বণিক সমিতির সভাপতি সফিউল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘এই জুয়ায় জড়িয়ে অনেক ব্যবসায়ী ও কৃষক পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি উঠতি বয়সী যুবক ও শিক্ষার্থীরাও জুয়া এবং মাদক সেবনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যার ফলে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়, চুরি-ছিনতাই ও অপরাধপ্রবণতা।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার জানানোর পরও এসবের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধি কিংবা পুলিশ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
তাদের দাবি, বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করেই নির্বিঘ্নে চলছে এই জুয়ার আসর। প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
ভাতগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান মাহাফুজার রহমান মাফু বলেন, ‘খরকার দিঘির জুয়ার আসর বন্ধে বহুবার চেষ্টা করেছি, পুলিশকেও জানিয়েছি। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং জুয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসে।’
উপজেলা সদরের বনগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল কাইয়ুম হুদা জানান, এসব জুয়ার আসর নিয়ে উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার আলোচনা হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জুয়ার আসরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তারপরও জুয়া নির্মূলে পুলিশ বা প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, ‘সংশ্লিষ্ট এলাকার চিহ্নিত ব্যক্তিরাই এসব আসরের আয়োজক। জুয়ার আসর বন্ধ করতে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
এ বিষয়ে সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম হাবিবুল ইসলাম বলেন, ‘জুয়ার বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে অধিকাংশ জুয়ার আসর খোলা মাঠ, নদীর চর বা নির্জন স্থানে বসায় পুলিশ পৌঁছানোর আগেই জুয়াড়িরা পালিয়ে যায়।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, শুধু নিয়মিত অভিযান নয়, জুয়ার আসরে অর্থ জোগানদাতা সুদ-কারবারি ও আয়োজকদের চিহ্নিত করে দৃশ্যমান ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিলেই কেবল এই চক্র ভাঙা সম্ভব। অন্যথায়, প্রতি রাতেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে আশঙ্কা তাদের।
সময়ের আলো/মহু