এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মোট ২৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিলেও তাদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থী উপস্থিতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শূন্য পাসের তালিকায় থাকা পাঁচটি বিদ্যালয়ের মধ্যে চারটি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার এবং একটি হরিপুর উপজেলার।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চারজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অনভারডিঘি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষার্থী ছিল সাতজন, পাস করেনি একজনও। মাধবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাঁচজন এবং তাওরিগাঁ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাঁচজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
অন্যদিকে, হরিপুর উপজেলার রামপুর ভাতুরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তিনজনই অকৃতকার্য হয়েছে। অর্থাৎ, পাঁচটি বিদ্যালয়ের মোট ২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে শূন্যজন।
নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার অভিযোগ
শূন্য পাসের এই ফলাফল নিয়ে অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, কয়েকটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান হয় না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণের সংকট এবং ভাঙাচোরা অবকাঠামোও শিক্ষার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
অভিভাবকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ কমছে। এর প্রভাব পড়ছে পরীক্ষার ফলাফলে।
অভিভাবকদের দায়ও দেখছেন স্থানীয়রা
তবে শুধু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করতে নারাজ অনেকে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কৃষিপ্রধান এই এলাকার অনেক পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে খেত-খামারের কাজে যুক্ত করেন। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায় এবং পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
স্থানীয় ও অভিভাবকদের কেউ কেউ মনে করছেন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক — তিন পক্ষের সমন্বিত দায়িত্বের ঘাটতিই এমন ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষকদের ব্যাখ্যা
বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি ও অভিভাবকদের অসচেতনতা ফলাফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ। গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষা উপকরণ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
আকচা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসায় তাদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা থাকে না। ফলে পরীক্ষার ফলাফলে এর প্রভাব পড়েছে।
মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাহেরুল ইসলাম বলেন, প্রথমে ২৪ জন এসএসসি শিক্ষার্থী ছিল তাদের মধ্যে ১৯ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। আর পাঁচ জন শুধু পরীক্ষা দিয়েছে। এলাকার আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং বিদ্যালয়ের ভাঙাচোরা অবকাঠামো সহ বিভিন্ন সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।
তবে শূন্য পাস করা আরও কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
জেলার সামগ্রিক ফলাফলেও হতাশার চিত্র
এদিকে ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দেওয়া তথ্য মতে জেলার সামগ্রিক এসএসসি ফলাফলও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জেলায় মোট ১৭ হাজার ৬৮৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৯ হাজার ৮৮৬ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৪৬৪ জন। জেলায় মোট পাসের হার ৫৫ দশমিক ৯০ শতাংশ।
এছাড়া পরীক্ষা শুরুর সময় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী-মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩৯টি কেন্দ্রে একযোগে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোট ২৩ হাজার ২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ২৩টি কেন্দ্রে এসএসসি (সাধারণ) পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৭ হাজার ৮৩৩ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া ৮টি কেন্দ্রে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩ হাজার ২২৫ জন এবং ৮টি কেন্দ্রে কারিগরি (ভোকেশনাল) শাখায় ১ হাজার ৯৪৪ জন শিক্ষার্থী। তবে এর মধ্যেই পাঁচটি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই পাস না করায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
পাঁচটি বিদ্যালয়ের ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে জেলা শিক্ষা বিভাগ। কেন এসব প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন আকতার।
তিনি বলেন, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল কেন এত খারাপ হয়েছে, তার কারণ অনুসন্ধান করা হবে। তদন্তে কোনো ধরনের অনিয়ম, গাফিলতি বা শিক্ষার পরিবেশের ঘাটতি পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন উঠেছে দায় নিয়ে
শিক্ষাবিদ ও স্থানীয়দের মতে, একটি বিদ্যালয়ের ফলাফল শুধু পরীক্ষার কয়েক মাস আগে প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তঃসম্পর্ক, অভিভাবকের সচেতনতা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং শিক্ষা উপকরণের সরবরাহ সবকিছুই জড়িত।
ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচটি বিদ্যালয়ের ২৪ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা শুধু একটি ফলাফল নয়; বরং প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এখন তদন্তের মাধ্যমে উঠে আসবে এই ফল বিপর্যয়ের পেছনে আসলে দায় কার এবং আগামী দিনে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানোন্নয়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সময়ের আলো/আতা