চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) আওতাধীন এলাকায় তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। শহরের বাইরের এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। এছাড়া, কারখানাগুলোতে কমে গেছে উৎপাদন। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি জমিতে সেচ কার্যক্রম।
এদিকে, এই ঘাটতি মোকাবিলায় অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ধান-চাল উৎপাদনে প্রসিদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত নওগাঁ জেলায় বর্তমানে ৭০০ -এর অধিক চালকল কারখানা রয়েছে। এছাড়া জেলায় খাদ্য ও খাদ্যজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ ছোট-বড় কারখানা রয়েছে।
নেসকোর আওতাধীন নওগাঁ পৌরসভার সুলতানপুর এলাকায় অবস্থিত ঘোষ অটোমেটিক রাইস মিল। কারখানাটিতে বুধবার দুপুর ১২টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রায় ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেল ব্যবহার করে মেশিন চালু রাখতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এতে লোকসানের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চালকল কারখানাটির মালিক দ্বিজেন ঘোষ বলেন, ‘ডিজেল দিয়ে মেশিন চালানোর ফলে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে ডিজেল খরচ কমানোর জন্য কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে না।’
নওগাঁ বিসিক পল্লীতে অবস্থিত নাসিম ব্রাদার্স অটোমেটিক রাইস মিল। কারখানাটির ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ১ থেকে দেড় ঘন্টা লোডশেডিং থাকছে। এতে কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা থাকলেও, ডিজেল খরচ কমাতে সব সময় জেনারেটর চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’
নওগাঁ শহরের কাজীর মোড় এলাকায় পঞ্চভাই হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল হক বলেন, ‘আগস্টের শুরু থেকেই তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। প্রতিদিন ভোরে হোটেল খুলি এবং বন্ধ করি রাত ১১টায়। এ সময়ের মধ্যে অন্তত ৫ থেকে ৬ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে।’
এদিকে, নওগাঁ শহরের তুলনায় গ্রাম এলাকায় লোডশেডিং আরও বেশি। গ্রামের কোনো কোনো এলাকায় দিনে-রাতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। আমন মৌসুমে কৃষি জমিতে সেচ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।’
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভীর নলকূপের অপারেটর ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘লোডশেডিং না হলে যে জমিতে সেচ দিতে ২ ঘণ্টা সময় লাগত, সেটা এখন তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। কারেন্টের অবস্থা এ রকম চলতে থাকলে, ধান বাঁচানোই কষ্ট হয়ে যাবে।’
ধামইরহাট উপজেলা সদর বাজার এলাকার থানা মোড়ের কাপড় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে বাসা-বাড়ি কোথাও টেকা যাছে না। বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে স্থানীয় এক লোকের বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়ার চুক্তি আছে। দিনের মধ্যে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটরওয়ালাও সবসময় বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে পারছেন না। তার সঙ্গে প্রত্যেক ব্যবসায়ীর মাসে ৫০০ টাকা চুক্তি আছে। এখন পরিস্থিতির কারণে ১ হাজার টাকা চাইছে।’
নওগাঁ সদর উপজেলার নওগাঁ পৌর এলাকা, বদলগাছী এবং পত্নীতলার কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নেসকো। নওগাঁর ১১টি উপজেলার বাকি এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। প্রতিদিন পিক ও অফ-পিক আওয়ারে গড়ে ৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও, ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম পাওয়া যাচ্ছে।
নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর মহাব্যবস্থাপক মাহবুব জিয়া বলেন, ‘নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর অধীনে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৩ লাখ ৩৫ হাজার। প্রতিদিন ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম পাওয়া যাচ্ছে।’
সময়ের আলো/মহু