চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ভয়াবহ বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, জাহাজের আবদ্ধ চেম্বার গ্যাসমুক্ত না করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাজ করানো এবং দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় খবর না দিয়ে উদ্ধারে বিলম্ব করার কারণে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে ফায়ার সার্ভিস ও ফায়ার সেফটি সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ৯ শ্রমিকের মধ্যে ৭ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন— হাবিবুর রহমান, পলাশ দাশ, সানি দাশ, মনসুর আলী, নাসির উদ্দিন, মো. খোকন এবং মো. রানা। নিহতদের সবাই স্থানীয় ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।
গ্যাসমুক্ত না করেই ঝুঁকি, এরপর চিকিৎসার অবহেলা
প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকদের বিবরণ থেকে জানা যায়, শুক্রবার সকালে জাহাজের তলদেশে থাকা একটি এলএনজি ট্যাংকের চারপাশ কেটে ফোরম্যান ও শ্রমিকেরা সরানোর চেষ্টা করেন। এ সময় কাটা অংশের গর্ত দিয়ে কেমিক্যাল ও বিষাক্ত গ্যাস বের হতে শুরু করলে পরপর একাধিক শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে ভেতরে পড়ে যান। ফোরম্যান এবং মাস্ক পরা এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা উদ্ধার করতে নামলে তারাও জ্ঞান হারান।
উদ্ধারে অংশ নেওয়া শ্রমিক মোহন জলদাসসহ সহকর্মীদের মারাত্মক অভিযোগ, বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত শ্রমিকেরা সবাই ঘটনাস্থলেই মারা যাননি। উদ্ধারের পর ইয়ার্ড প্রাঙ্গণে কোনো জরুরি অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা ছিল না। প্রাথমিক চিকিৎসা ও দ্রুত অক্সিজেন দিতে পারলে কয়েকজনের প্রাণ বাঁচানো যেত বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
মালিকপক্ষের দীর্ঘ নীরবতা ও ফায়ার সার্ভিসকে দেরিতে খবর
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, সকাল ৯টার দিকে দুর্ঘটনা ঘটলেও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গোপন রেখে নিজস্ব উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। দুর্ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা পর সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ এবং সময়মতো উদ্ধার অভিযান শুরু না হওয়ায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়েছে বলে মনে করছেন উদ্ধারকারীরা।
বিকেল দুইটার দিকে কারখানা মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিন ঘটনাস্থলে এসে দাবি করেন, কারখানা বন্ধ থাকলেও সেফটি বিভাগের লোকজনের দায়িত্ব পালনকালে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
কারিগরি ত্রুটি ও সুরক্ষার অভাব
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, জাহাজটির প্রধান কার্গো বা ইঞ্জিন রুম গ্যাসমুক্ত করা হলেও ভেতরের ছোট আবদ্ধ চেম্বারগুলোতে হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন মনোক্সাইড, অ্যামোনিয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো অত্যন্ত বিষাক্ত কেমিক্যাল জমে ছিল। সঠিক সেফটি চেকিং ছাড়া শ্রমিকদের নামানোর কারণেই এই ট্র্যাজেডি।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, ঠিক কোন গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখতে সেনাবাহিনী ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অভিজ্ঞ দল তদন্ত শুরু করেছে।
১০ বছরে ১৩৫ প্রাণহানি : কোনোভাবেই থামছে না 'মৃত্যুকূপ'
সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং খাতে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কোনো নতুন বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী 'গ্রিন শিপইয়ার্ড' করার তাগিদ থাকলেও বাস্তবায়ন গতি ধীর।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান : বিলসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ১০ বছরে (২০১৫-২০২৫) সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় দুর্ঘটনায় অন্তত ১৩৫ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং দুই শতাধিক শ্রমিক পঙ্গুত্ব বরণ বা আহত হয়েছেন।
গত এক দশক আগে সীতাকুণ্ডে ১৫০টির মতো ইয়ার্ড চালু থাকলেও বর্তমানে মাত্র ২০টি ইয়ার্ড সচল রয়েছে। কারখানা কমলেও মৃত্যু ও ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে রয়ে গেছে। তাছাড়া এই সচল ২০টি ইয়ার্ডের মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ পেলেও সেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য কমপ্লায়েন্স সেভাবে রক্ষা হচ্ছে না বলে ক্ষোভ রয়েছে শ্রমিকনেতাদের।
বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য
বিলসের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টু দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, স্থায়ী নিয়োগ না থাকা, অতিরিক্ত কাজ করানো, অভিজ্ঞ সেফটি অফিসারের অভাব এবং মালিকপক্ষের সাময়িক লাভের মানসিকতা।
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও শ্রমিকনেতা তপন দত্ত বলেন, চুক্তিভিত্তিক অনভিজ্ঞ শ্রমিক দিয়ে বিপজ্জনক কাজ করানোর ফলেই এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের তদন্ত কমিটিতে কোনো শ্রমিক প্রতিনিধি থাকে না, যার ফলে প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যায়।
ঠিকাদাররা শ্রমিকদের ঠিকমতো বেতন দেন না— এমন অভিযোগ তুলে ফোরম্যান মো. জামাল উদ্দিন বলেন, কারখানাগুলোয় ১০০ জন ঠিকাদারের মধ্যে ৯৮ জনই অদক্ষ। তারা বিভিন্ন প্রভাব বিস্তার করে অনিয়মের মাধ্যমে লাইসেন্স করে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ফলে কারখানাগুলোয় দুর্ঘটনা কমছে না। অনিয়মকারী ঠিকাদাররা শ্রমিকদের ঠিকমতো বেতনও দেন না। শ্রমিকদের কাজ করার সময় তাদের সুরক্ষার বিষয়টি খেয়াল রাখা হয় না।
স্থানীয় শ্রমিক ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর মালিকপক্ষ প্রায়ই প্রকৃত তথ্য লুকানোর চেষ্টা করে ও সাংবাদিকদের তথ্য প্রচারে বাধা দেওয়ার চাপ প্রয়োগ করে।
ভাটিয়ারীর এই সর্বশেষ মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি আবারও প্রমাণ করল যে, সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্পে মুনাফা অর্জনের তুলনায় শ্রমিকের জীবন রক্ষার ন্যূনতম সুরক্ষা আয়োজন আজও কতটা অবহেলিত ও উপেক্ষিত।
সময়ের আলো/আতা