সংসার জীবনের দীর্ঘ পথচলায় একে অপরের ছায়া হয়ে ছিলেন তারা। মৃত্যুর পরলোকযাত্রাতেও যেন বিচ্ছেদ সইলো না তাদের। পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে বার্ধক্যজনিত কারণে স্বামীর মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রেললাইনে ট্রেনের নিচে আত্মাহুতি দিয়েছেন স্ত্রী। পরিবারের দাবি, স্বামীর শোক সইতে না পেরেই প্রাণ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ পাশাপাশি চিতায় দাহ করা হয়েছে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মালিগাঁও গ্রামে। মৃত দম্পতি হলেন— মালিগাঁও গ্রামের হরেন্দ্রনাথ বর্মণ (৮০) ও তার স্ত্রী নিত্যবালা বর্মণ। হরেন্দ্রনাথ স্থানীয় একটি মন্দিরের পূজারি ছিলেন এবং নিত্যবালাও তার সঙ্গে নিয়মিত ধর্মীয় কাজে যুক্ত থাকতেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাত ৯টার দিকে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হরেন্দ্রনাথ বর্মণ। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী নিত্যবালা গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘক্ষণ স্বামীর মরদেহের পাশে বসে বিলাপ করেন। পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা সারা রাত বাড়িতে অবস্থান করলেও ভোরের দিকে সবার অগোচরে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান নিত্যবালা।
সকালে অনেকক্ষণ তাকে খুঁজে না পাওয়ায় স্বজনরা দুশ্চিন্তায় পড়েন। একপর্যায়ে মালিগাঁও এলাকায় রেললাইনের পাশে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা।
পরিবারের ধারণা, রাজশাহী থেকে পঞ্চগড়গামী আন্তঃনগর ‘বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নিচে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে পারিবারিক শ্মশানে পাশাপাশি দুটি চিতায় হরেন্দ্রনাথ ও নিত্যবালার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এ সময় পুরো এলাকায় এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
নিহত দম্পতির ছেলে রবীন চন্দ্র বর্মণ বলেন, বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। তার মৃত্যুর পর মা সারা রাত বাবার শিয়রে বসে কেঁদেছেন। সকালে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হন। পরে আমরা রেললাইনে তার মরদেহ পাই। মা বাবাকে ছাড়া বেঁচে থাকতে চাননি বলেই হয়ত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রতিবেশী যতীন চন্দ্র বর্মণ বলেন, তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত গভীর ভালোবাসার। একজনের মৃত্যুর শোক অন্যজন নিতে পারেননি। এমন মৃত্যু আমরা সচরাচর দেখি না, এটি অত্যন্ত কষ্টের।
আটোয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান জানান, পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি পুলিশকে জানানোর আগেই সৎকার সম্পন্ন করেছেন। ঘটনাটি যেহেতু রেললাইনে মৃত্যুর সাথে সংশ্লিষ্ট, তাই রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।
সময়ের আলো/এনএন