সীতাকুণ্ডে গ্যাস ট্র্যাজেডি : ২ ভাইকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবার

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

সাপ্তাহিক ছুটির দিনটির সকালটা অন্য আট-দশটা ছুটির দিনের মতোই শান্ত হতে পারতো। পরিশ্রমে ক্লান্ত দেহটা একটু জিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন ৫০

2026-08-15T00:05:18+00:00
2026-08-15T00:06:16+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
সীতাকুণ্ডে গ্যাস ট্র্যাজেডি : ২ ভাইকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবার
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৫ এএম  আপডেট: ১৫.০৮.২০২৬ ১২:০৬ এএম
নিহত মনসুর ও নাসির। ছবি : সময়ের আলো
সাপ্তাহিক ছুটির দিনটির সকালটা অন্য আট-দশটা ছুটির দিনের মতোই শান্ত হতে পারতো। পরিশ্রমে ক্লান্ত দেহটা একটু জিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন ৫০ বছর বয়সি নাসির। কিন্তু কারখানার একটি ফোনকলই বদলে দিল সবকিছু। বিশ্রামের আকুতি ভুলে কাজের টানে ঘর ছেড়েছিলেন তিনি, সাথে ছিলেন বড় ভাই মনসুরও (৫৫)। কয়েক ঘণ্টা পর দুজনেই ফিরলেন— তবে হেঁটে নয়, স্বজনদের কাঁধে লাশ হয়ে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী মৌলভীপাড়ায় এখন শুধুই কান্নার রোল। ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজের ঘটনায় যে প্রাণহানি ঘটেছে, তার নির্মম শিকার এই দুই সহোদর। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে একই ইয়ার্ডে ঘাম ঝরিয়ে আসছিলেন তারা— মনসুর ছিলেন ফোরম্যান আর নাসির কাটারম্যান। কিন্তু বছরের পর বছর সেবা দিয়েও শেষ রক্ষা হলো না তাদের।

দুই সন্তানকে এক লহমায় হারিয়ে এখন বাগরুদ্ধ বৃদ্ধ বাবা। বৃদ্ধ দাদার পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছে নিহত মনসুরের দুই মেয়ে ও নাসিরের এক মেয়ে। শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার।

পিতা সেকান্দর হুসাইন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার চার ছেলের মধ্যে দুজন প্রবাসে থাকে, আর মনসুর ও নাসির দেশে ছিল। গত ১৭ বছর ধরে তারা একই শিপইয়ার্ডে কাজ করছে। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির কারণেই আজ আমার দুটি ছেলে মারা গেল। দুর্ঘটনার পর বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত শ্রমিকদের যদি আটকে না রেখে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হতো, তবে হয়তো আমার সন্তানদের প্রাণ হারাতে হতো না।


চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় বাবার নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রুভেজা চোখে বিলাপ করছিল নাসিরের দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র মেয়ে ইভা। অবরুদ্ধ কণ্ঠে সে বলছিল, আজ শুক্রবার ছিল, বাবা বাড়িতে একটু বেশি সময় ঘুমাতে চেয়েছিলেন। বারবার বলছিলেন আজ বিশ্রাম নেবেন, কাজে যাবেন না। কিন্তু কারখানা থেকে একের পর এক ফোন দিয়ে তাকে ডেকে নেওয়া হলো। আমার বাবা আর হেঁটে ফিরলেন না...

অন্যদিকে বড় ভাই মনসুরের পরিবারেও এখন চরম অন্ধকার। দুই মেয়ের জনক মনসুরই ছিলেন পুরো সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছোট মেয়েটির পড়াশোনা এখনো শেষ হয়নি। চোখের সামনে বাবার এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে তার ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তায় ঢাকা পড়েছে।

উদ্ধার কাজে গাফিলতি ও মালিকপক্ষের অনুপস্থিতির অভিযোগ
ঘটনার খবর পেয়েই ইয়ার্ডে ছুটে গিয়েছিলেন স্বজনরা। তবে তাদের অভিযোগ, শুরুতে কারখানার ভেতরে কাউকেই ঢুকতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ। বাধ্য হয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকরা কারখানার মূল ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং নিথর দেহগুলো বের করে আনতে শুরু করেন।

পরবর্তীতে জানা যায়, একটি জাহাজের ইঞ্জিন রুমের ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস (প্রাথমিকভাবে কার্বন মনোক্সাইড ধারণা করা হচ্ছে) লিকেজ হলে পরীক্ষার জন্য গিয়েই প্রথম দফার শ্রমিকরা অচেতন হন। তাদের বাঁচাতে গিয়ে একে একে বিষাক্ত গ্যাসের শিকার হন আরও কয়েকজন।


হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি বাড়লেও দেখা মেলেনি কারখানা কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিনিধির। ফলে আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রিয়জনের লাশ বুঝে নিতেও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় স্বজনদের।

একই পরিবারের দুই উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে মৌলভীপাড়া এলাকা এখন শোকাতুর। প্রতিবেশী মাইনুল আলম আক্ষেপ করে বলেন, দুজন মানুষ বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে পরিবার দুটিকে টেনে তুলেছিলেন। এক নিমেষে দুটি সংসার ধ্বংস হয়ে গেল।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ঘাটতি এবং ছুটির দিনে জোরপূর্বক কাজে ডাকার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ফেটে পড়েছে এলাকাবাসী। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া কেন শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামানো হলো, তা খতিয়ে দেখতে হবে। অন্যদিকে অবহেলাজনিত এই মৃত্যুর জন্য দায়ী মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা দলকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ও এতিম হয়ে পড়া পরিবারগুলোর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দ্রুত সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   সীতাকুণ্ড  গ্যাস ট্র্যাজেডি  নিহত  সময়ের আলো  চমেক  বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: