সমস্যা-সংকট সত্ত্বেও যশোরে বেড়েছে রেলের যাত্রী ও আয়। গত এক বছরে যশোর রেলওয়ে জংশন থেকে ট্রেনের যাত্রী এবং রাজস্ব আয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ। আড়াই লক্ষাধিক অতিরিক্ত যাত্রীর মাধ্যমে টিকেট বিক্রির রাজস্ব আয়ের পরিমাণ পৌনে ৬ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই স্টেশন থেকে ভ্রমণ করেছেন ১১ লক্ষাধিক যাত্রী যাদের কাছে টিকেট বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ২৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, রেলওয়ের যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি কিছু সমস্যা ও সংকট দূর করা সম্ভব হলে ট্রেনের যাত্রী এবং রাজস্ব আদায় আরও বৃদ্ধি পাবে। আর রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিকেটবিহীন যাত্রীর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হলে রাজস্ব আদায়ের হার আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব।
এ বিষয়ে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, কিছু পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হলে রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান বাড়বে, সঙ্গে রাজস্ব আয়ও বাড়বে। অবিলম্বে বেনাপোল-যশোর-ঢাকা রুটে একটি প্রভাতি আন্তঃনগর ট্রেনসহ মোট ৩টি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দাবি আদায়ে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি ২০২৩ সাল থেকে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছে।
যশোর রেলওয়ে জংশনের স্টেশনমাস্টার সাইদুজ্জামান জানান, গত এক বছরে যশোর জংশনে যাত্রী ও রাজস্ব আয়ের পরিমাণ অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। টিকেটবিহীন যাত্রীর সংখ্যা কমানো গেলে এই হার আরও বৃদ্ধি পাবে। জনবল সংকটের কারণে সবসময় যথাযথভাবে টিকেট চেক করা সম্ভব হয় না। যশোর স্টেশন দিয়ে দৈনিক গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করে থাকেন।
এত বিপুলসংখ্যক যাত্রীর জন্য ওয়াশরুমের সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল। পার্শ্ববর্তী রেলবাজারে কোনো পাবলিক টয়লেট না থাকায় সেখানে কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষের চাপও স্টেশনের টয়লেটের ওপরে পড়ে। এ ছাড়া বাজারে কোনো ডাস্টবিন নেই। এ কারণে স্টেশনের পার্কিং এলাকায় ময়লার স্তূপ জমে থাকে। এসব সমস্যার সমাধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলেও জানান স্টেশনমাস্টার।
যশোর রেলওয়ে জংশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্ধবছরে যশোর রেলওয়ে জংশন থেকে মোট ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৬ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছেন। এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮৩ হাজার ২৭৫ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্ধবছরে এই জংশন থেকে ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৭৩০ জন যাত্রী ভ্রমণ করেন যা থেকে রাজস্ব আদায় হয় ১৮ কোটি ২৫ লাখ ১৯ হাজার ৪২৯ টাকা। অর্থাৎ বিগত অর্থবছরে যশোর জংশন থেকে যাত্রী বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার। আর রাজস্ব আয় বেড়েছে ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ হিসাবে যাত্রী বৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ আর রাজস্ব আয় বৃদ্ধির হার ৩১ শতাংশ।
ট্রেনের যাত্রী বাড়লেও রেলসেবার মান নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাদের মতে, বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটের কারণে ট্রেন পিছিয়ে রয়েছে। এসব দূর করা সম্ভব হলে রেলওয়ের যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। আর সেবার মান বাড়লে যাত্রীও যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি রাজস্ব আয়ও বাড়বে। যাত্রীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রেনের সময়সূচি মেনে চলা, ক্রসিংয়ের সময় ও সংখ্যা কমিয়ে আনা, স্টেশনে ও ট্রেনের ভেতর যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্টেশনের বিশ্রামাগার, টয়লেটসহ অন্য সুবিধাদি বৃদ্ধি করা।
নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই লিটন মিয়া বলেন, ট্রেনের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার জন্য আলাদা পুলিশ থাকে। এখানে আমার নেতৃত্বে ফাঁড়িতে মোট ১৫ জন পুলিশ সদস্য আছেন। তাদের মধ্যে দুজন বদলি হয়ে গেছেন। আমরা চারজন করে পালাক্রমে ডিউটি করি। এসআই মো. লিটন মিয়া আরও বলেন, এত বড় স্টেশনে মাত্র চারজন পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। ছিনতাইকারীরা সাধারণত ট্রেন চলতে শুরু করলে প্ল্যাটফর্ম এলাকার বাইরে গিয়ে ব্যাগ টেনে নিয়ে পালিয়ে যায়। তাই অনেক সময় তাদের শনাক্ত কিংবা আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ জন্য স্টেশনে পুলিশ ফোর্স বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনও ট্রেনে টিকেটবিহীন ভ্রমণের প্রবণতা রয়েছে। এই হার কমিয়ে আনা সম্ভব হলে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। পাশাপাশি কিছু ট্রেনের সুবিধাদি বৃদ্ধি করা গেলেও ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
যাত্রীদের অভিযোগ, যশোর-খুলনা রুটে ট্রেনের সবচেয়ে বড় সমস্যা ক্রসিং। সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় ক্রসিং পড়লেই দীর্ঘসময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর ট্রেনে দায়িত্বরত পুলিশ যাত্রীদের নিরাপত্তার চেয়ে নানা অজুহাতে টাকা তোলায় বেশি ব্যস্ত থাকে। গবাদিপশু ও বিভিন্ন মালামাল বহনকারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করাই যেন তাদের প্রধান দায়িত্ব! প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তাব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়। যশোর স্টেশন প্ল্যাটফর্মে খুনের ঘটনাও ঘটেছে। ছিনতাই হয় অহরহ।
ট্রেনের অভ্যন্তর ও ওয়াশরুম ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। স্টেশনের ওয়েটিংরুম ও বাথরুমের অবস্থাও ভালো না। ওভারব্রিজে ছাউনি না দেওয়ায় রোদ-বৃষ্টিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, যশোর থেকে পদ্মাসেতু হয়ে ঢাকায় যাওয়ার জন্য সকালে একটি ট্রেন খুবই দরকার। এ ছাড়া রূপসী বাংলার কোচ সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। রূপসা ও সীমান্ত এক্সপ্রেসের সময়মতো চলাচল করা জরুরি। বিলম্বের কারণে এই দুই ট্রেনের যাত্রী কমছে। যাত্রীদের চাহিদা থাকায় সাগরদাঁড়ি ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসে অন্তত তিনটি কোচ বাড়াতে হবে।
বিশ্রামাগার সংস্কার করতে হবে। স্টেশনে অন্তত ৬টি ওয়াশরুম স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া দ্বিতীয় প্ল্যাটফর্ম, ওভারব্রিজে ছাউনি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গাড়ি পার্কিং, অ্যাপ্রোচ সড়কও মেরামত করা প্রয়োজন।
সময়ের আলো/এসএকে