কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি মার্কিন শিল্পী ডলি পার্টন মারা গেছেন। মঙ্গলবার ন্যাশভিলে ৮০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয় বলে পারিবারিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ডলি পার্টন শান্তিপূর্ণভাবে মারা গেছেন। পরে তার প্রচারক মার্সেল পারিজো জানান, স্বল্প সময়ের ক্যানসারের সঙ্গে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করার পর তার মৃত্যু হয়েছে।
ডলি পার্টন পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সংগীতজীবনে তিন হাজারের বেশি গান লিখেছেন। ‘জোলিন’, ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’, ‘কোট অব মেনি কালার্স’ এবং ‘৯ টু ৫’-এর মতো গান তাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে।
তিনি ৪৯টি অ্যালবাম প্রকাশ করেন এবং ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার জেতেন। কান্ট্রি সংগীতের পাশাপাশি পপ সংগীতেও তিনি ব্যাপক সাফল্য পান। কেনি রজার্সের সঙ্গে গাওয়া ‘আইল্যান্ডস ইন দ্য স্ট্রিম’ও তার অন্যতম জনপ্রিয় গান।
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির একটি ছোট এককক্ষের কেবিনে জন্ম ডলি পার্টনের। ১২ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। পরিবারকে তিনি একসময় ‘চরম দরিদ্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
শৈশবেই সংগীতের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। মাত্র ৭ বছর বয়সে গিটার বাজানো শেখেন এবং নিজের গান লেখা শুরু করেন। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে সংগীতের ক্যারিয়ার গড়তে ন্যাশভিলে পাড়ি জমান।
১৯৬৫ সালে মনুমেন্ট রেকর্ডসের সঙ্গে প্রথম চুক্তি করেন ডলি। পরের বছর বিয়ে করেন কার্ল ডিনকে। ১৯৬৭ সালে জনপ্রিয় সংগীত অনুষ্ঠান ‘দ্য পোর্টার ওয়াগনার শো’-তে নিয়মিত অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি।
১৯৭১ সালে ‘জোশুয়া’ গান দিয়ে প্রথমবারের মতো শীর্ষস্থানীয় সাফল্য পান। এরপর ১৯৭৪ সালে পোর্টার ওয়াগনারের সঙ্গে কাজ ছেড়ে একক ক্যারিয়ারে মনোযোগ দেন। এ সময় ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ গানটি তার একক ক্যারিয়ারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৯০-এর দশকে হুইটনি হিউস্টন গানটির নতুন সংস্করণ গাওয়ার পর এটি বিশ্বজুড়ে আরও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
ডলি পার্টন শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ১৯৮০ সালে ‘৯ টু ৫’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে অভিনয় করা সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।
সিনেমাটির জন্য ‘৯ টু ৫’ শিরোনামের গানটিও লেখেন ও পরিবেশন করেন তিনি। গানটি কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকার ও সমতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি জনপ্রিয় সংগীত হয়ে ওঠে।
এরপর ‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস’ ও ‘স্টিল ম্যাগনোলিয়াস’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি।
বিশ্বখ্যাতি ও বিপুল সাফল্য অর্জনের পরও ডলি পার্টনের সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি হয়ে ওঠে তার মানবিক কাজ।
১৯৮৬ সালে টেনেসিতে একটি বিনোদন পার্ক কিনে সেটির নাম দেন ‘ডলিউড’। একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন ডলিউড ফাউন্ডেশন। পরে গড়ে তোলেন ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’, যার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় ৩০ কোটির বেশি বই শিশুদের কাছে পৌঁছেছে।
বাবা পড়তে না পারার বিষয়টি ডলি পার্টনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বাবার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই শিশুদের বই দেওয়ার এই উদ্যোগকে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন তিনি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটিতে করোনাভাইরাস গবেষণায় ১০ লাখ ডলার অনুদান দেন। মডার্নার টিকা উন্নয়নেও অর্থ সহায়তা করেছিলেন।
ডলি পার্টনের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনও ছিল আলোচিত। কার্ল ডিনের সঙ্গে ১৯৬৬ সালে বিয়ে হয় তার। প্রায় ৫৯ বছর তারা বিবাহিত ছিলেন।
তবে কার্ল ডিন সবসময়ই জনসম্মুখ থেকে দূরে ছিলেন। ২০২৫ সালের মার্চে ৮২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
স্বামীর মৃত্যুর পর ডলি পার্টন বলেছিলেন, তার নিজের স্বাস্থ্যের প্রতিও যথেষ্ট যত্ন নিতে পারেননি তিনি। এ সময় তিনি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।
ডলি পার্টনের মৃত্যুতে শেষ হলো মার্কিন সংগীত ও বিনোদন জগতের এক দীর্ঘ ও বর্ণিল অধ্যায়। সংগীত, সিনেমা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তার অবদান তাকে দেশটির সবচেয়ে প্রিয় ও প্রভাবশালী শিল্পীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সময়ের আলো/কেএইচ