কমলগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে এখন আমন ধান চাষের প্রস্তুতি চলছে। আউশ ধান ঘরে তোলার পর জমি তৈরি ও আমনের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। এর মধ্যেই গ্রামীণ মাঠে দেখা মিলছে অন্যরকম এক দৃশ্য—হালচাষের পর কাদামাখা জমিতে চলছে দেশীয় মাছ ধরার উৎসব।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মেশিনে জমি চাষ করার সময় কাদার ভেতর থেকে উঠে আসছে শিং, মাগুর, কৈ, পুঁটি, টাকি, টেংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ। আর সেই মাছ ধরতে জমির পাশে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ ছোট জাল, কেউ ঝুড়ি বা পাত্র নিয়ে মাঠে নামছেন। আবার কেউ কাদায় হাত দিয়েই মাছ ধরছেন।
বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা ধানক্ষেতে দীর্ঘদিন মাছের বিচরণ থাকে। আমন চাষের আগে জমি প্রস্তুতের সময় মেশিনে মাটি উল্টেপাল্টে দেওয়ায় কাদার ভেতর থাকা মাছও বেরিয়ে আসে। তখনই জমির আশপাশে তৈরি হয় উৎসুক মানুষের ভিড়।
পতনঊষারের কৃষক মরম আলী বলেন, এ বছর বৃষ্টিপাত ও জমিতে পানির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল। ফলে অনেক জমিতে দেশীয় মাছ দেখা যাচ্ছে। আমনের জন্য জমি প্রস্তুত করতে গিয়ে মাছ পাওয়া গ্রামের মানুষের জন্য বাড়তি আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শমশেরনগরের কৃষক রাফিউল আহমদ বলেন, বাড়ির পাশের একটি জমিতে হালচাষ চলার সময় কয়েকজনকে মাছ ধরতে দেখে তিনিও সেখানে যান। কিছুক্ষণ মাছ ধরে প্রায় দেড় কেজি দেশীয় মাছ পেয়েছেন।
কৃষক সাজু মিয়া বলেন, আউশ ধান চাষের সময় জমিতে পানি থাকায় মাছগুলো সেখানে আশ্রয় নেয়। ধান কাটার পর আমন চাষের জন্য জমি প্রস্তুতের সময় কাদা ও পানি নড়াচড়া করলে মাছগুলো বেরিয়ে আসে। তখন আশপাশের মানুষ মাছ ধরতে মাঠে নেমে পড়েন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মৌলভীবাজারে প্রায় ৩৮ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ এলাকার আউশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। এখন আমন চাষের জন্য জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের কাজ চলছে। এ মৌসুমে জেলায় প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাল উদ্দীন বলেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় আমনের চারা রোপণ শুরু হয়েছে। অনেক এলাকায় রোপণ প্রায় শেষের দিকে। এবার আউশের ফলনও সন্তোষজনক হয়েছে।
তবে কৃষিজমিতে দেশীয় মাছের উপস্থিতি আনন্দের হলেও এসব মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে মৎস্য বিভাগের। একসময় বর্ষায় কমলগঞ্জের হাওর, বিল, খাল ও ফসলের মাঠে দেশীয় মাছের ব্যাপক বিচরণ থাকলেও জলাশয় সংকোচন, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রজাতিই এখন কমে গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, বর্ষায় কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের মধ্যে পানির সংযোগ দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলাভূমি ও মাছের বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ করা গেলে দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য ধরে রাখা সম্ভব।
কমলগঞ্জের মাঠে এখন তাই একদিকে আমনের নতুন ফসলের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কৃষক, অন্যদিকে কাদামাখা জমিতে মাছ ধরার আনন্দে মেতে উঠেছেন গ্রামীণ মানুষ। বর্ষার এই চেনা দৃশ্য যেন কৃষি ও জলজ জীববৈচিত্র্যের একসঙ্গে বেঁচে থাকার গল্পই তুলে ধরছে।
সময়ের আলো/এসএকে